নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ হলো বিজিবি-বিএসএফের বৈঠক
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে চার দিনব্যাপী মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে। তবে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সীমান্ত বৈঠকের ইতিহাসে এই প্রথম এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। চার দিনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে যৌথ আলোচনার নথিতে উভয়পক্ষ স্বাক্ষর করলেও, প্রথা মেনে দুই বাহিনীর ডিজি কোনো যৌথ সাংবাদিক বৈঠক করেননি। সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, বৈঠক শেষে কোনো প্রেস ব্রিফিং না করে কেবল একটি যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশে নতুন সরকার এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজ্য সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানদের নেতৃত্বে এটিই ছিল প্রথম বৈঠক। সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এবং বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় প্রতিনিধিদল অংশ নেয়।
এবারের সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক অব্যাহতভাবে লোকজনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টার বিষয়টি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অবৈধ পুশইনকে মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক প্রটোকলের চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। জবাবে ভারতীয় পক্ষ দাবি করেছে, তাদের এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ আইন মেনে এবং অবৈধভাবে বসবাসকারীদের লক্ষ্য করে নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া সম্মেলনে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, ভারত থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান রোধ এবং মানব পাচার প্রতিরোধের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়াসহ অন্যান্য অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ এবং সীমান্তে চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের নিষ্পত্তি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত কথা হয়েছে। পাশাপাশি তিনবিঘা করিডোর দিয়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থেকে দহগ্রাম পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপনসহ বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা করেছেন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানরা।
অন্যদিকে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিএসএফ জওয়ান ও ভারতীয় নাগরিকদের ওপর হামলা এবং সীমান্ত বেড়া ভেঙে ফেলার মতো বিষয়গুলো উত্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারত-বাংলাদেশের মোট ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি অংশ পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার সরকার অনুপ্রবেশকারীদের লক্ষ্য করে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ ও বহিষ্কার) নামের একটি পর্যায়ক্রমিক থ্রি-ডি অ্যাকশন চালুর ঘোষণা দিয়েছে, যা এবারের সম্মেলনে দুই পক্ষের মধ্যে বাড়তি স্নায়ুচাপের সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সাল থেকে চলে আসা দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের এই দ্বিপক্ষীয় সম্মেলনটি প্রতি বছর পর্যায়ক্রমে নয়াদিল্লি ও ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এবারের বৈঠক শেষে কোনো যৌথ সংবাদ সম্মেলন না হলেও উভয়পক্ষই সীমান্ত এলাকায় শান্তি, স্থিতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/172310