পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে দুই বিশ্বনেতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নিজেদের জাতীয় গৌরবের ত্রাণকর্তা দাবি করা দুই শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট এমন কিছু দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন, যা জেতা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু হারের গ্লানি এড়াতে কীভাবে এর শেষ করবেন, তাও তারা বুঝে উঠতে পারছেন না। নিজেদের অভ্রান্ত ভাবার একধরনের অন্ধ মোহ এ দুই নেতাকে কৌশলগত ভুল স্বীকার করতে বাধা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বা ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরান বা ইউক্রেন উভয় সংকটের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
তবে উভয় দেশের শাসনব্যবস্থা এবং সংঘাতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য রয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কিয়েভ দখলের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ ইতোমধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘায়িত হয়েছে। সোভিয়েত রেড আর্মি যেভাবে নাৎসি আক্রমণ প্রতিহত করে বার্লিন দখল করেছিল, তার চেয়ে বেশি সময় নিয়েও পুতিনের বাহিনী পূর্ব ইউক্রেনের সামান্য অংশ দখল করতে পেরেছে এবং সেখানেও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে না। এই যুদ্ধ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন রুবল এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিলেও জাতীয় গৌরবের কোনো দৃশ্যমান সুফল বয়ে আনেনি।ক্রেমলিনের প্রোপাগান্ডা মেশিনারির পক্ষে এই ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফ্রন্টলাইন থেকে শত শত মাইল দূরের বেসামরিক নাগরিকেরা ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে তেল শোধনাগার থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলি উড়তে দেখছেন। তারা মুদ্রাস্ফীতির কারণে নিজেদের মজুরি কমে যাওয়া টের পাচ্ছেন। এমনকি গত মাসের ‘বিজয় দিবস’-এর প্যারেডও ছিল অস্বাভাবিক রকমের সাদামাটা। ইউক্রেনীয় বিমান হামলার আশঙ্কায় রেড স্কয়ারের আকাশে এবার ট্যাংক ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঐতিহ্যবাহী মহড়া চালানো যায়নি।
সরকারি জনমত জরিপেও পুতিনের প্রতি সমর্থনের ঘাটতি দেখা গেছে, যা পরে ‘পদ্ধতিগত’ সংশোধনের মাধ্যমে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পুতিন এই যুদ্ধকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখেন, ফলে স্বাধীন দেশের বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সমপর্যায়ে আলোচনায় বসা তার জন্য সহজ নয়।
অন্যদিকে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনীর চেয়ে সেলিব্রিটিসুলভ অহংবোধে বেশি তাড়িত হলেও এর প্রভাব একই রকম। তিনি পুতিনের মতোই মনে করেন যে শক্তিশালী দেশের স্বার্থের কাছে ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের কোনো মূল্য নেই।
তিনি মনে করেন ইউক্রেনের জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। একইভাবে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং সিআইএ-এর যুদ্ধকালীন বিশ্লেষণ অনুযায়ী ইরানকে আকাশপথ থেকে বোমা মেরে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করানো সম্ভব নয় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার মাধ্যমে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ঘটাতে পারে-এমন সব কৌশলগত বাস্তবতাকে ট্রাম্প মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা হিসেবে মেনে নিতে নারাজ।
পুতিনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই সংকটে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও, ড্রোনের আঘাতে রাশিয়ার শিল্প অবকাঠামো ধ্বংস হওয়া এবং তেলের বাড়তি দামের পেছনে লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেই সুবিধা বাতিল হয়ে গেছে। তবে ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইউক্রেনকে দেওয়ার মতো বাড়তি মনোযোগ এখন ট্রাম্পের নেই। এটি পুতিনের জন্য সুবিধাজনক হলেও, ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের আরো সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে হাঙ্গেরির নির্বাচনে ভিক্টর অর্বানের পরাজয়ের পর ইউরোপ থেকে কিয়েভে সাহায্য পাঠানোর পথ উন্মুক্ত হয়েছে এবং ইউরোপের নেতৃত্বে একটি শান্তি উদ্যোগের গতিবেগ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মস্কোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে কথা হয়েছে এবং এই সপ্তাহে কিয়ার স্টারমার কিয়েভের সমর্থনে ডাউনিং স্ট্রিটে জেলেনস্কি, জার্মানির ফ্রিডরিখ মার্জ এবং ফ্রান্সের ইমানুয়েল মাক্রোঁর সঙ্গে একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করেছেন।
রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থি আন্দোলনগুলো ইউরোপকে অভিবাসন এবং উদারনৈতিক অবক্ষয়ের কারণে ধ্বংসোন্মুখ একটি সভ্যতা হিসেবে দেখে থাকে। তবে এটি উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম শক্তিকে অবমূল্যায়ন করার শামিল। স্বৈরাচারী শাসকেরা যেখানে ভিন্নমতকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে দেখেন, সেখানে বহুমাত্রিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধী মতকে মেনে নেওয়াই হলো এই ব্যবস্থার আসল শক্তি। স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো সত্যের চেয়ে আনুগত্যকে বেশি প্রশ্রয় দেয়, যার ফলে বাস্তবতা একসময় হারিয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রক্রিয়াটি সংবিধান, অবাধ নির্বাচন, মুক্ত গণমাধ্যম এবং স্বাধীন আদালতের মাধ্যমে সংশোধন করা সম্ভব হলেও রাশিয়ায় তা অসম্ভব। আর এই কারণেই ইউরোপীয় গণতন্ত্রগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের শাসনব্যবস্থা কেবল নীতিগতভাবেই সেরা নয়, বরং বাস্তবেও অনেক বেশি শক্তিশালী।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/172164