‘‘সামরিক শাসক জিয়া” একটি ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা

‘‘সামরিক শাসক জিয়া” একটি ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা

ইতিহাসের যেকোনো বড় ব্যক্তিত্ব বা রাজনৈতিক নেতার মূল্যায়ন সমাজ, সময় এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হতে পারে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে “সামরিক শাসক” হিসেবে আখ্যায়িত করা  একটি “বিশেষ মহলের রাজনৈতিক বা ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা” হিসেবে দেখার যে বিতর্ক, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান একটি সমীকরণ। একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুই পরস্পরবিরোধী ধারণার পেছনের যুক্তি এবং বাস্তবতাকে এভাবে খতিয়ে দেখা যায়: ১. “সামরিক শাসক” বলার পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যারা জিয়াউর রহমানকে সামরিক শাসক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন, তাদের প্রধান ভিত্তি হলো তার ক্ষমতায় আরোহণের প্রক্রিয়া: পটভূমি: ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের নির্মম ট্র্যাজেডি এবং পরবর্তী ৩ ও ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীতে এক চরম চেইন অব কমান্ডের সংকট তৈরি হয়। সেই পটভূমিতে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (DCMLA) এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (CMLA) ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। 

আইনি কাঠামো: যেহেতু তিনি সামরিক পোশাক পরিহিত অবস্থায় এবং সামরিক আইন বা মার্শাল ল’ (Martial Law) জারি থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন, তাই তাত্ত্বিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ “সামরিক শাসক” বা “মিলিটারি ডিক্টেটর” হিসেবে গণ্য করেন। ২. কেন একে “বিশেষ মহলের প্রচারণা” বা আংশিক সত্য বলা হয়? অন্যদিকে, যারা একে “ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা” বা সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করেন, তাদের যুক্তির ভিত্তি হলো জিয়ার ক্ষমতার রূপান্তর (Transition) এবং তার অনন্য দেশপ্রেমিক ভাবমূর্তি।

স্বেচ্ছায় বেসামরিকীকরণ (Civilianization): বিশ্বের অন্যান্য চেনা সামরিক শাসকদের (যেমন পাকিস্তানের আইয়ুব খান বা পরবর্তীকালের এরশাদ) মতো জিয়াউর রহমান আজীবন সামরিক ডিক্টেটর হিসেবে থাকতে চাননি। তিনি অত্যন্ত দ্রুত ও সুপরিকল্পিতভাবে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন। তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ গঠন করেন এবং ১৯৭৯ সালে একটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে বেসামরিক সংসদীয় ব্যবস্থার দিকে যাত্রা শুরু করেন। তাই তাকে কেবল “সামরিক শাসক” বলে আটকে রাখা তার গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অবদানকে অস্বীকার করার শামিল।

সংকটকালীন ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা: ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ যখন সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন, গৃহযুদ্ধ এবং সার্বভৌমত্ব হারানোর চরম ঝুঁকিতে ছিল, তখন সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি নিজে কোনো রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেননি। বরং রাষ্ট্র যখন অচল, তখন তিনি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। ফলে একে “ক্ষমতা লোভী সামরিক অভ্যুত্থান” বলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

মুক্তিযুদ্ধের লিগ্যাসি বনাম স্বৈরাচারী তকমা: জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার ঘোষক। একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল তার এই বিপুল জনসমর্থন এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে ম্লান করার জন্য তাকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বা অন্যান্য স্বৈরাচারীদের সমগোত্রীয় “সামরিক শাসক” হিসেবে এককাতারে দাঁড় করাতে চায়। এটি তার ঐতিহাসিক মর্যাদাকে খাটো করার একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল বা ন্যারেটিভ (Narrative)।

গণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি: একজন সাধারণ সামরিক শাসক সাধারণত জনবিচ্ছিন্ন থাকেন এবং বুলেটের জোরে শাসন করেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান ছিলেন আপাদমস্তক গণমুখী। তার ১৯ দফা কর্মসূচি, খাল খনন এবং গ্রামে গ্রামে ঘুরে সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন তাকে একজন জনপ্রিয় পপুলিস্ট (Populist) নেতা বানিয়েছিল, যা কোনো প্রথাগত সামরিক শাসকের চরিত্রে দেখা যায় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, জিয়াউর রহমানের শাসনকালকে একটি “সামরিক-বেসামরিক মিশ্রিত রূপান্তরকালীন শাসন” (Military-Civilian Transitionary Regime) হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। শুরুর দিকটা সামরিক আইনের অধীনে হলেও, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতি ছিল বেসামরিক ও গণতান্ত্রিক। ফলে, যারা তার বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন, গ্রামীণ উন্নয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে তাকে কেবলই একজন “সামরিক স্বৈরশাসক” হিসেবে চিত্রায়িত করেন, তাদের সেই অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট বা একটি নির্দিষ্ট মহলের ন্যারেটিভ বিল্ডআপ (Propaganda) হিসেবে গণ্য করার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ রয়েছে।


লেখক :

এড. সাজিদ ওয়াসিক বাঁধন

আইনজীবী-বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/172040