বগুড়ায় সংরক্ষণাগার না থাকায় নষ্ট হচ্ছে ৪শ’কোটি টাকার সবজি, বছরে উৎপাদন দুই হাজার কোটি টাকা

বগুড়ায় সংরক্ষণাগার না থাকায় নষ্ট হচ্ছে ৪শ’কোটি টাকার সবজি, বছরে উৎপাদন দুই হাজার কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার : সারা দেশের মধ্যে অন্যতম সবজি উৎপাদনের জেলা বগুড়া। প্রতি সবজি উৎপাদন মৌসুমে এ জেলায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার সবজি উৎপদান হয়। স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা পূরণের পরেও সবজির বড় একটি অংশ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় উদ্বৃত্ত সবজির ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়া সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ সবজি উৎপাদন মৌসুমে (খরিপ-১, রবি ও খরিপ-২) এ জেলায় ২৪ হাজার ৯শ’ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত সবজির পরিমাণ ৫ লাখ ২২ হাজার ৬৫২ মেট্রিকটন, যার বাজার মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা (প্রতি কেজি ৩৫-৪০ টাকা)। উৎপাদিত এই সবজির মধ্যে ২ লাখ ৪ হাজার ৭৭৫ মেট্রিকটন জেলার চাহিদা পূরণ করে।

অবশিষ্ট সবজির মধ্যে বীজ ও ক্ষয়ক্ষতি বাদ ১৫ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ৬৬ শতাংশ সবজি দেশের বাইরে রপ্তানি করা হয়। উদ্বৃত্ত সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ পরেও বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি অফিস সূত্র থেকে আরও জানা যায়, ২০২৫-২৬ সবজি উৎপাদন মৌসুমে বগুড়া উৎপাদিত উদ্বৃত্ত সবজির পরিমাণ ২ লাখ ৭ হাজার ১৮৫ মেট্রিকটন। এরমধ্যে ১৬ শতাশং অর্থাৎ ৪৩ হাজার ২২৯ মেট্রিকটন সবজি বীজ, ক্ষয়ক্ষতি এবং রপ্তানি হয়ে যায়। অবশিষ্ট ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৫৬ মেট্রিকটন সবজির বাজার মূল্য (৩৫ টাকা কেজি ধরে) ৭৯৪ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এই সবজির বড় একটি অংশ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের পরেও প্রায় ৪শ’ কোটি টাকার সবজি নষ্ট হয়ে যায়।

কৃষি বিভাগের তথ্য ও কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শীতকালে অর্থাৎ রবি মৌসুমে সবচেয়ে বেশি সবজি উৎপাদন হয়। রবি মৌসুমের শুরুতে এবং শেষে সবজির বাজার দর সন্তোষজনক থাকলেও মৌসুমের মাঝামাঝি তা একেবারে তলানিতে নামে। ওই সময় বাড়তি উৎপাদনে দাম না পেয়ে কৃষকরা-টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা রাস্তায় ফেলে দেওয়াসহ জমিতেই তা নষ্ট করে ফেলেন। এবার দাম না পেয়ে জমিতেই অনেক কৃষক তাদের আলু নষ্ট করেছেন, গো-খাদ্যও করেছেন অনেকেই।

বগুড়া সদর উপজেলার শ্যামবাড়িয়া এলাকার কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, গেল রবি মৌসুমে দেড় বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করি। মৌসুমের শুরুতে পাইকারিতে ভালো দাম পেলেও মাঝামাঝি সময়ে দাম একেবারেই কমে যায়। দাম কমতে কমতে এমন পর্যায়ে ঠেকে তখন গাড়ি ভাড়া দিয়ে বাজারে গেলেও ফুলকপি বিক্রি করে খরচ তোলা কষ্ট হয়ে যায়, ফলে বাধ্য হয়ে জমিতেই অনেক কপি নষ্ট করতে হয়েছে।

আরেক কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, এবার শিম চাষ করে মোটামুটি ভালো দাম পেলেও মৌসুমের শেষের দিকে দাম না পেয়ে গরু-ছাগলের খাদ্য হিসেবে শিম ও গাছ কাজে লাগিয়েছি। পাশের রবিবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গেল রবি মৌসুম অনেকটা ছিল রোজার মধ্যে ওই সময় সবজির দাম অনেক কম ছিল। জমিতে বেগুনের ফলন ভালো হলেও ভালো দাম পাইনি। অথচ ওই বেগুন সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে অন্য সময় তা বিক্রি করে লাভবান হওয়া যেত।

কৃষক মোমিনুল ইসলাম বলছেন, বাজারে সবজির সরবরাহের ওপর দামের ওঠা-নামা হয়। তারা বাজারে গিয়ে বুঝতে পারেন সরবরাহ বেশি, দাম কম। সংরক্ষেণ উপায় নেই জেনে বাধ্য হয়েই কম দামে তা বিক্রি করতে হয়। আবার কোন কোন দিন বিক্রি না করেই ফিরে আসতে হয়, তখন ওই ফসল রাস্তার ধারে ফেলা দেওয়া বা গরুর খাবার করা ছাড়া উপায় থাকে না। এই কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, উন্নত বিশ্বের মতো সবজি সংরক্ষণ করা গেলে আমরা যেমন ফসলের ন্যায্য দাম পেতাম, তেমনি মানুষও সারা বছর সাধ্যের মধ্যে সব ধরনের সবজি খেতে পারতো।

জানতে চাইলে বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়া উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বলেন, কৃষকরা কষ্ট করে বছরজুড়ে ফসল উৎপাদন করলেও বেশিরভাগ সময় তারা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পান না। দাম না পেয়ে অনেক সময় কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল জমিতেই নষ্ট করেন বা রাস্তা ধারে ফেলে দেন। ন্যায্য দামের অনিশ্চিয়তায় তারা দিন দিন সবজি উৎপাদনে নিরুসাহিত হচ্ছেন।

অথচ এই সবজি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে কৃষক তাদের সবজির ন্যায্য দাম পাবেন। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নানা মাধ্যমে সবজির সংরক্ষণাগার নির্মাণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, নানা প্রতিশ্রুতিও মিলেছে অথচ এটি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/171977