যে কোনও বিষয় নিয়ে ওভারথিঙ্কিং ! হতে পারে মারাত্মক ক্ষতি
লাইফস্টাইল ডেস্ক : যে কোনও নেতিবাচক ভাবনাই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ওভারথিঙ্কিংয়ের জেরেই একইভাবে ক্ষতি হতে পারে নিজের — ঠিক এই কথাটিই আজকাল যেন মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। হালফিলে ‘ওভারথিঙ্কিং’ বা অতিরিক্ত চিন্তা যেন এক নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে, বিশেষ করে এই জেনারেশনের মধ্যে। বহু মানুষ আজ এমন একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন যেখানে তারা একটানা কোনো একটা বিষয় নিয়ে এত বেশি ভাবছেন যে, সেটা শুধু মনের উপর নয়, শরীরের উপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, “ওভারথিঙ্কিং হল এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ একটা বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত ভাবতে ভাবতে বাস্তবতা থেকে অনেকটা সরে যায়। সেটা হতে পারে সম্পর্ক, কাজ, ভবিষ্যৎ, বা অতীতের কোনও ঘটনা। কিন্তু এই চিন্তাভাবনার ফল শুধু মানসিক দুর্বলতা নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেখা দিতে পারে অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা, এমনকি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনাও। এটা একটা প্রোগ্রামড হ্যাবিট, মানে ছোট থেকে আমরা চিন্তা করতে শিখি, কিন্তু কখন সেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, সেটা অনেকেই বুঝতে পারি না।”
ওভারথিঙ্কিং-এর প্রভাব শুধু মানসিক নয়, শারীরিক দিকেও ব্যাপক ক্ষতিকারক। বহু গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত চিন্তা করার ফলে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর প্রভাব ফেলে। উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা, ঘুমের অভাব, এমনকি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হতে পারে। WHO-র রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ মানসিক চাপজনিত সমস্যায় ভুগছেন, যার মধ্যে বিশাল একটা অংশ এই ‘ওভারথিঙ্কিং’ সমস্যায় আক্রান্ত। ২০২৩ সালে ভারতের মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা সংস্থা NIMHANS-এর এক রিপোর্টে উঠে এসেছে, ভারতের শহরাঞ্চলে প্রায় ৬৫% যুবক-যুবতী এই সমস্যায় আক্রান্ত, যদিও অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।
এই সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব?
“প্রথমত, নিজেকে বুঝতে হবে, আপনি চিন্তা করছেন নাকি আপনি ‘ওভারথিঙ্ক’ করছেন। তারপরে ধাপে ধাপে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মেডিটেশন, ইয়োগা, ডিপ ব্রিদিং, রুটিন তৈরি করা, নিজের জন্য সময় রাখা, ফোন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে একটু বিরতি নেওয়া—এসবই হতে পারে ভালো উপায়। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নিতে হবে, সেটা মোটেও লজ্জার নয়।”
তবে এই সমস্যার একটা বড় দিক হলো সামাজিক চাপ। আমরা সবাই চাই সফল হতে, আমরা চাই সবাই আমাদের ভালো বলুক। সেই চাহিদা থেকেই শুরু হয় অল্পতেই অতিরিক্ত ভাবনা। কেউ একটা খারাপ কথা বললেই আমরা সেটা নিয়ে সারাদিন মাথা ঘামাই, কেউ ফোন ধরল না মানে হয়তো কিছু খারাপ ভাবছে—এইসব ভ্রান্ত ধারণা থেকেই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত মানসিক অস্থিরতা। সমাজ মনোবিদ শ্রীমতী অনন্যা সেন বলেন, “এটা একপ্রকার সাইকোলজিক্যাল ট্র্যাপ। নিজেই নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে।”
এইসব মানুষের জন্য খুশির খবর হলো, ‘ওভারথিঙ্কিং’ কাটিয়ে উঠতে গেলে প্রথমেই দরকার সচেতনতা। সবাইকে বুঝতে হবে যে এটা রোগ নয়, অভ্যাস। আর অভ্যাস যেমন গড়ে ওঠে, তেমনই বদলানোও যায়। নিয়মিত শরীরচর্চা, নিজের জন্য সময় বের করা, খোলামেলা কথা বলা, কাউন্সেলিং নেওয়া—এসবই হতে পারে সুস্থ জীবনের প্রথম পদক্ষেপ।
নিজের এবং কাছের মানুষের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করুন। একটু সময় দিন, শুনুন, পাশে থাকুন। কারণ এই ‘ভাবনার অতিরিক্ত বোঝা’ কখন যে মারাত্মক আকার নেয়, তা কেউ বলতে পারে না।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/171965