৪০ বছর এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন মোক্তার

৪০ বছর এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন মোক্তার

বেড়া (পাবনা) প্রতিনিধি : মানুষের জীবনে প্রতিকূলতা আসবেই, কিন্তু সেই প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সাহসিকতার পরিচয়। এমনই এক অনন্য উদাহরণ পাবনার বেড়া পৌর এলাকার শাহপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মোক্তার হোসেন (৬৫)।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে থামাতে পারেনি, বরং জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে শক্তভাবে মোকাবিলা করে তিনি আজও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন সমাজে। গত ৪০ বছর ধরে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি করে পাঁচ সদস্যের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছেন তিনি।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি পোলিও রোগে আক্রান্ত হন। প্রায় ছয় দশক আগে গ্রামবাংলায় পোলিও সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা ছিল না বললেই চলে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক সুবিধা না থাকায় তার পরিবারও রোগটির ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি।

ফলে উন্নত চিকিৎসার পরিবর্তে তাকে দেওয়া হয় কবিরাজি চিকিৎসা। ফলে শৈশব থেকেই তার ডান পা ও হাত অকেজো হয়ে পড়ে। এ কারণে অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা সবকিছু থেকেই বঞ্চিত হন তিনি। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার মানসিক শক্তিকে হার মানাতে পারেনি।

প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও লেখাপড়ার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান মেধাবী মোক্তার হোসেন। তিনি অনেক কষ্ট করে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যান। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তার শিক্ষাজীবন সেখানেই থেমে যায়। তবে শিক্ষা থেকে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে নেননি। বরং নিজের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অন্যদেরকে শেখানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এভাবেই শুরু হয় তার জীবনের নতুন অধ্যায় ‘টিউশনি পেশা’।

পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে খুব অল্প বয়সেই তাকে সংগ্রামে নামতে হয়। জীবিকার তাগিদে তিনি বেছে নেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশন পড়ানোর কাজ। শুরুতে আশপাশের এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে।

কিন্তু তখনও তার চলাচলের প্রধান ভরসা ছিল একটি বাঁশের লাঠি। এক পা ও এক হাত অকেজো অবস্থায় লাঠির সাহায্যে দূরের বাড়িতে গিয়ে টিউশনি করা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। প্রতিদিনের এই কষ্টকর যাত্রা যেন তার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।

সময়ের সাথে সাথে টিউশনির চাহিদা বাড়তে থাকে। ফলে দূরের শিক্ষার্থীদের কাছেও যেতে হয় তাকে। এতে করে লাঠির ওপর ভর করে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মোক্তার হোসেন একটি সাইকেল কেনার সিদ্ধান্ত নেন।

নিজের জমানো সামান্য টাকা এবং কিছু টাকা ধার করে তিনি একটি পুরাতন সাইকেল কিনে ফেলেন। কিন্তু এক পায়ে সাইকেল চালানো যে কতটা কঠিন, তা তিনি খুব দ্রুতই বুঝতে পারেন। অনেকেই হয়তো এই পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিতেন, কিন্তু মোক্তার হোসেন তাদের মতো নন।

প্রায় এক মাসের নিরলস চেষ্টা, ব্যর্থতা আর পুনরায় উঠে দাঁড়ানোর দৃঢ় মানসিকতা সবকিছু মিলিয়ে অবশেষে তিনি সফল হন। বাঁশের লাঠি সাথে নিয়েই এক পায়ে সাইকেল চালানো শিখে ফেলেন তিনি। এই অর্জন শুধু একটি দক্ষতা নয়, বরং তার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়। এরপর থেকে তার পথচলা অনেক সহজ হয়ে যায়। এখন তিনি অনায়াসেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সাইকেল চালিয়ে যেতে পারেন।

গত চার দশক ধরে মোক্তার হোসেন এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন। তার এই নিরলস পরিশ্রম শুধু তার নিজের জীবনই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন। তার কাছে পড়াশোনা করা অনেক ছাত্র-ছাত্রী আজ সমাজে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত। কেউ শিক্ষক, কেউ সরকারি চাকরিজীবী, আবার কেউ ব্যবসায়ী। তাদের সবার জীবনের পেছনে রয়েছে এই নিঃস্বার্থ শিক্ষকের অবদান।

মোক্তার হোসেনের ছাত্র, বর্তমানে বেড়া ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মো. মাহবুব হোসেন বলেন, স্যার শুধু আমাদের বইয়ের পড়া শেখাননি, শিখিয়েছেন জীবনের কঠিন বাস্তবতার সাথে লড়াই করে টিকে থাকার সাহস। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে নিয়মিত আমাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াতেন, তা আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তার কাছ থেকেই শিখেছি, ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে জীবনে কোনো বাধাই বড় নয়।

মোক্তার হোসেন বলেন, এক পা ও এক হাত নিয়েই চার দশক ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াচ্ছেন। ঝড়-বৃষ্টি, কষ্ট কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। তার ছাত্রদের অনেকেই বড় বড় প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে কাজ করছে, এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/171709