বগুড়া দেশের প্রথম “ওয়াটার-স্মার্ট” সিটি কর্পোরেশন !
বাংলাদেশের ১৩তম সিটি কর্পোরেশন হিসেবে বগুড়ার আত্মপ্রকাশ শুধু প্রশাসনিক মর্যাদা বৃদ্ধির ঘটনা নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ নগর যেমন অপরিকল্পিত নগরায়ন, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট, জলাবদ্ধতা, দূষণ ও দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনার চাপে ধুঁকছে; বগুড়া এখনো সেই সংকটের পূর্ণ গভীরে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ বগুড়ার সামনে এখনো “আগে পরিকল্পনা, পরে সংকট” মডেলে এগোনোর সুযোগ আছে। বিশেষ করে যখন বগুড়ায় একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প, শিল্পায়ন, আবাসন সম্প্রসারণ, পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত এই নগরীর ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা কোথায়?
বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, কোনো শহরের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ টেকসই হয়না যদি তার পানি নিরাপত্তা দুর্বল হয়। ঢাকার মতো শহরে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর প্রতি বছর কয়েক মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। একসময় যে গভীর নলকূপে সহজে পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে বিপুল বিদ্যুৎ খরচ করেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এই ভুল পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি বগুড়ায় হলে ভবিষ্যতে শহরটিও একই সংকটে পড়বে। চিত্র: “ওয়াটার-স্মার্ট’ বগুড়ার জন্যে একটা কাল্পনিক স্কীম (কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে) অথচ বগুড়ার সামনে এখন একটি ভিন্ন পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে “ওয়াটার স্মার্ট সিটি” বা পানি-সচেতন নগর ব্যবস্থাপনার পথ।
এই প্রেক্ষাপটে গ্রে-ওয়াটার রিসাইক্লিং বা ব্যবহৃত পানির পুনর্ব্যবহার হতে পারে বগুড়ার জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। গ্রে-ওয়াটার বলতে মূলত বাথরুম, বেসিন, লন্ড্রি ও রান্নাঘর থেকে আসা পানিকে বোঝায়, যা টয়লেটের কালো বর্জ্য পানির মতো নয়। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই পানি পরিশোধন করে টয়লেট ফ্লাশিং, বাগান পরিচর্যা, রাস্তা পরিষ্কার, নির্মাণকাজ, পার্কের সেচ বা অগ্নিনির্বাপণ রিজার্ভ হিসেবে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব। বিশ্বের উন্নত শহরগুলো ইতোমধ্যে “ড্রিংকিং ওয়াটার শুধুমাত্র ড্রিংকিংয়ের জন্য” নীতিতে এগোচ্ছে। কারণ সব কাজে খাবার মানের পানি ব্যবহার অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে অযৌক্তিক। অস্ট্রেলিয়ার এর অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিডনি শহর ধাপে ধাপে হড়হ-ঢ়ড়ঃধনষব ৎবপুপষবফ ধিঃবৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন আবাসন ও শিল্প এলাকায় “পার্পল পাইপ” সিস্টেম চালু করেছে, যেখানে পুনর্ব্যবহৃত পানি আলাদা লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় টয়লেট ফ্লাশিং, সেচ ও পরিষ্কার কাজে ব্যবহারের জন্য।
বগুড়া এখনো এমন পর্যায়ে আছে যেখানে ভবিষ্যৎ আবাসন, শিল্প এলাকা ও নতুন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে শুরু থেকেই “ডুয়াল প্লাম্বিং” বা দুই ধরনের পানির লাইন বাধ্যতামূলক করা সম্ভব। এক লাইনে বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং অন্য লাইনে পুনর্ব্যবহৃত নন-পটেবল পানি। এখন সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে বিপুল ব্যয়ের রেট্রোফিটিং প্রয়োজন হবে না। বিশেষ করে বগুড়ার নতুন আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, শপিং কমপ্লেক্স, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পাঞ্চল এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে এই প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। শহরের বড় মসজিদগুলোতেও ওজুর পানি পুনর্ব্যবহার একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ হতে পারে। বগুড়ার জন্য এটি শুধু পরিবেশগত উদ্যোগ নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বিষয়। কারণ ভবিষ্যতের বিনিয়োগকারীরা শুধু রাস্তা বা জমি দেখবে না, তারা দেখবে শহরের পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই অবকাঠামো কেমন। যে শহর ভবিষ্যৎ পানি সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে, সেই শহরেই দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও কর্মসংস্থান গড়ে উঠবে। এখানে নগর পরিকল্পনার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বগুড়া যদি পরিকল্পিতভাবে “ওয়াটার সার্কুলারিটি জোন” তৈরি করতে পারে; যেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, গ্রে-ওয়াটার রিসাইক্লিং, জলাধার সংরক্ষণ, পার্ক ও নগর বনায়ন সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে। তাহলে এটি বাংলাদেশের প্রথম প্রকৃত জলবায়ু সহনশীল শহরগুলোর একটি হতে পারে। এক্ষেত্রে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একইসাথে ভবিষ্যৎ বিল্ডিং অনুমোদনের সাথে পানি পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা সংযুক্ত করা যেতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা ও আস্থা। মানুষকে বুঝাতে হবে যে এটি “ড্রেনের পানি” নয়; বরং নিরাপদভাবে পরিশোধিত নন-পটেবল পানি, যা বিশ্বের উন্নত শহরগুলো বহু বছর ধরে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ শহর এখনো সংকটের পরে পরিকল্পনা করে। বগুড়ার সামনে সুযোগ আছে সংকটের আগেই পরিকল্পনা করার। যদি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তাহলে বগুড়া শুধু একটি নতুন সিটি কর্পোরেশন নয় বাংলাদেশের প্রথম “মডেল ওয়াটার-স্মার্ট সিটি” হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
লেখক :
ড: ফয়সাল কবীর শুভ
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পরিবেশ গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদ,
সিডনী ওয়াটারে সিডনী ওয়াটারে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত,
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যানার্সের একজন ফেলো সদস্য