রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের হুমকিস্বরূপ
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিই হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে উন্নত হয়নি। বর্তমানের বাংলাদেশের রাজনীতি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে আমাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আজও সম্ভব হয়নি। একসময় যে দেশ স্বপ্ন দেখতো সেই দেশের বুকে আজ পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল দাঁড়িয়ে থাকলেও স্বপ্নের এই যাত্রাকে থমকে দেয় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। অর্থনীতিবিদদের মতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামোর বিস্তার নয় বরং উন্নয়ন মানে মানুষের মনে আস্থা। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সে আস্থা ভেঙে দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ খাতগুলো। অথচ একটি দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। এই বিনিয়োগ আসে আস্থা থেকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্প হাতে নিতে ভয় পান। অনিশ্চিত পরিবেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এর ফলশ্রুতিতে,উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের চেয়ে বিদ্যমান ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখাকে অধিক অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে মেগা প্রকল্প গুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে খরচ বেড়ে যাচ্ছে কমে যাচ্ছে চাকরির সুযোগ বাড়ছে বেকারত্ব। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য মতে,রাজনৈতিক ঝুঁকি ১ শতাংশ বাড়লে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ০.৮শতাংশ। আর প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া মানে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া যায় ফলাফল ক্রমবর্ধমান দরিদ্রতা। একই সাথে অর্থনীতির গতি মন্থর হলে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায় যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। বর্তমান পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতার আঁতুরঘরে পরিণত হয়েছে। এগুলো যেন এক একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় রাজনৈতিক সংঘাতকেন্দ্র। যেখানে একটি জাতির মেরুদন্ড শিক্ষার উপর নির্ভরশীল সেখানে রাজনৈতিক প্রভাবে শিক্ষার মান ব্যাহত হচ্ছে।বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর রাজনীতিকেন্দ্রিক সহিংসতা দেখলেই বুঝা যায় রাজনৈতিক স্থিরতা কেবলমাত্র শব্দেই সীমাবদ্ধ যার বাস্তবায়ন অধরাই রয়ে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানিমুখী শিল্প গুলো। দেশের রপ্তানি আয়ে সিংহভাগ আসে পোশাক খাত থেকে সেখানেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। এর প্রভাবে পোশাকখাতে রপ্তানি আয়ের হার কমে গিয়েছে এবং নতুন বিনিয়োগের স্থবিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। ইপিবির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চলতি ২০২৫ (জুলাই-মার্চ) অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ৫.৫১ শতাংশ কমে ২৮.৫৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। শুধু তাই নয় শীর্ষ ১০ টি রপ্তানি বাজারের মধ্যে নয়টি বাজারে বাংলাদেশ তার অবস্থান হারিয়েছে। তারা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা পর্যবেক্ষণ করে অর্ডার দেয়ায় সতর্ক হয়ে পড়েছেন। বিষয়টি আরো গভীর হয় যখন আমরা দেখি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শেয়ার বাজারের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ফলে লোকশানের হাত থেকে বাঁচতে দ্রুত শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে আসতে চান যার ফলে শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে কমে যায় এবং সুযোগের পতন ঘটে। অবরোধ, আন্দোলন কর্মসূচির কারণে পরিবহন ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে এতে কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে যায় যা সরাসরি প্রভাব পড়ে শেয়ারের দামের উপর। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সরকার বা নীতিনির্ধারকরা কার্যকর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না এই নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে যার ফলে শেয়ার লেনদেন কমে যায় বাজার স্থবির হয়ে পড়ে।একইসাথে আন্দোলন সহিংসতার কারণে রাস্তা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে যার কারণে কাঁচামাল সঠিক সময়ে কারখানায় পৌঁছাতে পারে না এবং উৎপাদন কমে যায়। উৎপাদিত পণ্য যথাসময়ে বাজারজাত না করার কারণে রপ্তানি কমে যাচ্ছে যা ডলার সংকট তৈরি করছে রিজার্ভের উপর চাপ ফেলছে। প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে ব্যবসায়ী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারছেনা যা বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি করে এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যায় যা মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি করে। এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মুদ্রাস্ফিতি বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে ফলে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে। দেশের উন্নয়ন ও জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন। কারণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্তই হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে গঠনমূলক রাজনীতি চর্চায় উৎসাহিত করতে হবে। অর্থনীতিতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে বৈদেশিক বিনিয়োগে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। রাজনীতির ধ্বংসাত্মক, জ্বালাও পোড়াও নীতির পরিবর্তে প্রশাসনিক কঠোরতা ও নিরপেক্ষ ভূমিকাই পারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে। জবাবদিহিতা, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন ও নিরপেক্ষতার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব। একটি সুশৃঙ্খল স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক :
মোছাঃ মুনিরা
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান
ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/171150