সবকিছুর দাম বাড়ে, বাড়ে না খামারির দুধের দাম
বেড়া (পাবনা) প্রতিনিধি : গরুর জন্য প্রতিদিন খড়, ঘাস, ভুসি, খৈল, ভুট্টা, ভিটামিন ও ওষুধ লাগে। অসুস্থ হলে ডাকতে হয় পশুচিকিৎসক। খামারে শ্রমিক থাকলে দিতে হয় মজুরি। গত ১০ বছরে এসব খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু দুধ বিক্রির সময় সেই বাড়তি খরচের হিসাব যেন কেউ রাখে না। পাবনার বেড়া পৌর এলাকার জোড়দহ মহল্লার খামারি জহুরুল ইসলামের আক্ষেপ করে বলেন, চাল, ডাল, তেল, ভুসি, খৈল, ওষুধ- সবকিছুর দাম বাড়ে। শুধু দুধের দাম বাড়ে না।
জানা যায়, জহুরুল ইসলামের খামারে ১৪টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি গাভী দুধ দিচ্ছে। তার খামারে প্রতিদিন প্রায় ১২০ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। কয়েকটি দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা বাড়িতে এসে দুধ কিনে নিয়ে যান।
প্রতি লিটার দুধের দাম পান ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। জহুরুল ইসলামের দাবি, ১০ বছর আগেও তিনি ৪০ থেকে ৪২ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করেছেন। এক দশকে দুধের দাম বেড়েছে মাত্র ৮ টাকার কাছাকাছি। অথচ এ সময়ে গো-খাদ্যের দাম আড়াইগুণের মতো বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও প্রায় দ্বি-গুণ হয়েছে।
শুধু জহুরুল নন, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের দুগ্ধ অঞ্চলের খামারিরা জানান, বাজারে সব পণ্যের দাম বাড়লেও তাদের উৎপাদিত কাঁচা দুধের দাম সেই হারে বাড়েনি। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধিই তাদের সবচেয়ে বেশি চাপে ফেলেছে।
ভুসি, খৈল, ভূট্টা, খড়, ঘাস, ভিটামিন, ওষুধ, কৃত্রিম প্রজনন, বিদ্যুৎ, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতি লিটার দুধ উৎপাদনের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বড় খামারিরা কোনোভাবে টিকে থাকলেও ছোট খামারিরা বেশি বিপাকে পড়েছেন। অথচ তাদের কাছ থেকে কম দামে কেনা দুধই প্যাকেটজাত হয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে।
বেড়ার যমুনার চরে অবস্থিত দক্ষিণ চরপেঁচাকোলা গ্রামের খামারি ও চরপেঁচাকোলা ডেইরি পিজি সমিতির সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন বলেন, তাদের সমিতির ৪০ জন সদস্যের (খামারি) মধ্যে আটজন নারী। চরাঞ্চল হওয়ায় খামারিরা মূল এলাকায় গিয়ে দুধ বিক্রি করতে পারেন না।
দুধব্যবসায়ীরা চরে গিয়ে ৪৭ থেকে ৪৮ টাকা লিটার দরে দুধ কিনে নিয়ে যান। তিনি বলেন, চরে খামার করা এমনিতেই কষ্টের। গো-খাদ্য আনতে খরচ বেশি, চিকিৎসা করাতেও সমস্যা। উৎপাদন খরচ ধরলে প্রতি লিটার দুধের দাম কমপক্ষে ৬০ টাকা হওয়া উচিত।
প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ অঞ্চলের ২৫ হাজারের বেশি খামারে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। এ এলাকা থেকে মিল্ক ভিটা, আড়ং দুধ, প্রাণ ডেইরি, ফার্মফ্রেশ, অ্যামোমিল্ক, আফতাব, রংপুর ডেইরিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে সারাদেশে বিক্রি করে।
বেড়া ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও খামারি মাহফুজা খানম বলেন, দুধ বিক্রি করে আগে খামারিদের ভালোভাবে সংসার চলত, গরুর খাবার কেনা যেত, কিছু টাকা হাতে থাকত। কিন্তু এখন খামারির হাতে কিছুই থাকে না। এই দামে দুধ বেচলে খামার টিকানো কঠিন।
প্রাণ ডেইরির এলাকা ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম, ইছামতী ডেইরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফসহ দুগ্ধ সংগ্রহকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, বাজারে দুধের চাহিদা, সরবরাহ পরিস্থিতি, পরিবহন ব্যয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণন খরচ বিবেচনা করেই তারা খামারি পর্যায়ে দুধের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করেন। একইসাথে এসব খরচ হিসাব করেই বাজারে প্যাকেটজাত দুধের বিক্রয়মূল্য ঠিক করা হয়।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/170944