বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে বগুড়ায় প্রাণ হারাচ্ছে কিশোর-তরুণ

বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে বগুড়ায় প্রাণ হারাচ্ছে কিশোর-তরুণ

স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়ায় বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে কিশোর-তরুণ ও যুবক। ঈদ আসলেই টিনএজদের বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বেড়ে যায়। মোটরসাইকেল চালিয়ে কার আগে কে যাবে এ নিয়ে শুরু হয় প্রতিযোগিতা।

ফিল্মী স্টাইলে বিকট শব্দে মোটরসাইকেল চালিয়ে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে প্রান হারাচ্ছে অনেক কিশোর তরুণ ও যুবক। সড়ক-মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে সাপের মত এঁকেবেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে ‘হিরোগিরি’ করতে গিয়ে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে তারা।

ঈদের ছুটিতে গত ৬ দিনে বগুড়ায় প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। এরমধ্যে ৬ জনই মোটরসাইকেল আরোহী। নিহতদের মধ্যে ৫ জনেরই বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। পুলিশ সূত্র জানায়, ঈদ-উল-আযহার ছুটির মধ্যে বগুড়ার কাহালু উপজেলায় দুটি বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা অপর মোটরসাইকেলের দুই আরোহী গুরুতর আহত হন।

ঈদের পরের দিন গত শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের কাহালু উপজেলার বীরকেদার ইউনিয়নের বারোমাইল নামক বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত তিন বন্ধু হলেন নওগাঁ সদর উপজেলার খাস নওগাঁ এলাকার আবুল কালাম আজাদের ছেলে রাহিম বিজয় (২০), একই উপজেলার চকদেব নুনিয়াপট্টি এলাকার ইউসুফ হোসেনের ছেলে মো.অপূর্ব (১৮) এবং সুরুজ বাঁশফোড়ের ছেলে প্রেম বাঁশফোড় (১৯)।

স্থানিয় সূত্রে জানা যায়, ওই দিন সন্ধ্যায় তিন বন্ধু রাহিম বিজয়, অপূর্ব ও প্রেম বাঁশফোড় একটি মোটরসাইকেলে চেপে দ্রুত গতিতে নওগাঁ থেকে বগুড়া সদরের একটি বিনোদন  উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে উল্লেখিত স্থানে পৌঁছুলে বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

এতে দুটি মোটরসাইকেলে থাকা তিন বন্ধুসহ মোট পাঁচজন আরোহী ছিটকে সড়কের ওপর পড়ে যান। এতে ঘটনাস্থলেই তিন বন্ধুর মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, অপর মোটরসাইকেলে থাকা অন্য দুই আরোহী মারাত্মক জখম ও আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন,ওই দুটি মোটরসাইকেলের গতি ছিল ঘণ্টায়  ১০০ কিলোমিটারের উপরে।

অপরদিকে, বগুড়ার শেরপুরে ঈদের দিন ঘুরতে গিয়ে মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে দুই যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন। গত বৃহস্পতিবার ঈদের দিন দিবাগত রাত পৌনে ৯টার দিকে শেরপুর-ধুনট আঞ্চলিক সড়কের শুভগাছা (শাফলজানি) এলাকায় এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন-পৌর শহরের উলিপুর এলাকার হারুন অর রশিদের ছেলে আবু রায়হান (২০) ও  শাহ বন্দেগী ইউনিয়নের ফুলতলা এলাকার তামিম (২০)।

ঈদের আনন্দ উদযাপন করতে একদল বন্ধু মোটরসাইকেল নিয়ে ধুনটের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে শুভগাছা এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে আসা আরও একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের সজোরে ধাক্কা দেয়।

ত্রিমুখী এই সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই আবু রায়হান মারা যান। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা আহত পাঁচজনকে উদ্ধার করে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাদের অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতালে নেয়ার পথেই তামিম হোসেনের মৃত্যু হয়। বাকি চারজনকে শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে গত শনিবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে শিবগঞ্জ উপজেলার লালদহ এলাকায় ট্রাকের চাপায় মোটরসাইকের আরোহী প্রধান শিক্ষক মো. আশরাফুল ইসলাম প্রামাণিক (৫৮) নিহত হন। নিহত আশরাফুলেন বাড়ি শিবগঞ্জের আটমুল ইউনিয়নের কুড়াহার গ্রামে। তিনি বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চকহবিবরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি অবশ্য নিয়ম মেনেই ধীর গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একটি ট্রাক তাকে চাপা দিলে তিনি নিহত হন।

জেলা পুলিশের এক পরিসংখান থেকে জানা যায়, চলতি বছর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে বগুড়া জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৬৯ জন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ১৩ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ১০ জন, মার্চ মাসে ১৪ জন ও এপ্রিল মাসে ১২ জন নিহত হন। সর্বশেষ মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় আরো ২০ জন নিহত হয়েছেন।

এছাড়া এর আগে ২০২৫ সালে এক বছরে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আরো ১২০ জন মানুষ। এ নিয়ে গত ১৭ মাসে জেলায় সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ১৮৯ জন। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রতিমাসে গড়ে বগুড়ায় ১০ জনেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। নিহতদের মধ্যে একটি বড় অংশ হলো কিশোর, তরুণ ও শিক্ষার্থী। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণরা বেপরোয়া গতিতে মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে নিহত হচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলেন, মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বেড়ে যাওয়া, যত্রতত্র রাস্তা পারাপার, মোবাইল ফোনে চোখ রেখে চলাচল এবং যানবাহনে সংখ্যা বেড়ে যাওয়া অন্যতম কারণ। এর বাইরে রয়েছে মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা,  জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনসাধারণের ওভারব্রিজ,  ফুটপাত না মানা।

সেইসাথে ফিটনেসবিহীন গাড়ি,চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতা, চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার, অপরিকল্পিত ও ভঙ্গুর সড়ক, ওভারক্রসিং, অতিরিক্ত গতি, ওভারব্রিজের স্বল্পতা, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, ট্রাফিক পুলিশের গাফিলতি, অনিয়ম, বিপজ্জনক ট্রাক, লাইসেন্সবিহীন গাড়ি ও চালক এবং বেপরোয়া গাড়ি চালানো। এভাবে নানাবিধ কারণে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে।

এ ব্যাপারে বগুড়া সদর ট্রাফিক ফাঁড়ির ইনচার্জ টিআই (প্রশাসন) মো: সালেকুজ্জামান খান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সড়কের ধারে বাজার বসানো, ওভারটেকিং, ওভারস্পিড, ওভারলোড, চালকের উপযুক্ত প্রশিক্ষনের অভাব, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালাানো, রাস্তার নিমার্ণক্রটি, ফিটনেস বিহীন যানবাহন, যাত্রীদের অসতর্কতা, ট্রাফিক আইন না মানা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জেব্রক্রসিং না থাকা, এবং জেব্রাক্রসিং গাড়ি চালক কর্তৃক না মানা, অরক্ষিত রেল ক্রসিং, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার করে কথা বলা,  মহাসড়কে ধীরগতি ও দ্রুতগতির যান একই সঙ্গে চলাচল, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, এবং মহাসড়ক ক্রসিং এ ফিডার রোডে যানবাহন উঠে যাওয়াই মূলত দায়ী।

এছাড়া বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো,হেলমেট ব্যবহার না করা, কার আগে কে যাবে এই প্রবণতা,  এলোমেলোভাবে চালানোর জন্যও দুর্ঘটনা প্রাণহানি হচ্ছে। এতে বেশি মারা যাচ্ছে টিনএজরা। এজন্য অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। টিনএজদের মোটরসাইকেল কিনে দেয়া অভিভাবকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/170940