হামে আক্রান্ত নবপ্রজন্ম : হুমকির মুখে দেশের ভবিষ্যৎ

হামে আক্রান্ত নবপ্রজন্ম : হুমকির মুখে দেশের ভবিষ্যৎ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (উএঐঝ) এর তথ্য অনুযায়ী হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। ডঐঙ এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে হামের ব্যাপক সংক্রমণ শুরু হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে। মার্চ মাসের দিকে হামে আক্রান্ত শিশু এবং মৃত্যুহার উভয়ই বাড়তে থাকে। যা বাংলাদেশের জন্য হুমকি স্বরূপ। হাম হলে শিশুদের মাঝে যেসব লক্ষণ দেখা যায় তা হলো উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া,ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি, মুখের ভেতরে ছোট ছোট সাদা দাগ। এ সমস্ত লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে জরুরি চিকিৎসা সেবার আওতায় আনা প্রয়োজন। যেহেতু হাম একটি সংক্রামক ভাইরাস জনিত রোগ, তাই এই রোগ প্রতিরোধেও ব্যাপক সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। হাম প্রতিরোধে সর্বোচ্চ কার্যকর উপায় হলো শিশুকে হামের টিকা (গগজ াধপপরহব) প্রদান করা। এছাড়াও সংক্রমিত ব্যক্তি হতে দূরে রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা’র মাধ্যমে হাম প্রতিরোধ সম্ভব। হাম সম্পূর্ণ নিরাময় যোগ্য রোগ না হলেও, বিগত বছরগুলোতে শিশুদের ধারাবাহিকভাবে হামের টিকা প্রদান ও গ্রহণের মাধ্যমে এ রোগটি নিয়ন্ত্রণে ছিলো। জনমনে প্রশ্ন আসে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি রোগ, কিভাবে এতো বৃদ্ধি পেলো, যা আজকে শত শত শিশুর প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, গত ২০২৪-২০২৫ সালে দেশে হামের টিকার ব্যাপক ঘাটতি ছিলো। এই টিকা ঘাটতিই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। যার দায় সেসময়কার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর কিছুটা হলেও বর্তায়। এছাড়াও পরিলক্ষিত হয়,গতবছর টিকাদান কর্মসূচি সময় মতো পরিচালিত হয়নি। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি ধাপে ধাপে কয়েকবার পিছিয়েছে। যতদিনে কার্যক্রম শুরু হয়েছে, ততদিনে রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময় টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পেছনে কারণ দেখা যায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়ার প্রেক্ষিতে আন্দোলন ও কর্মবিরতিতে যাওয়া। এছাড়াও ভ্যাকসিন সংকটের পূর্ববর্তী সময়ে স্পষ্ট তথ্য উপাত্ত না দিয়ে নানাভাবে প্রশাসন কে অসহযোগিতা করাও বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টির একটি অন্যতম কারণ। গতবছর টিকাদান কম হওয়ার পাশাপাশি, অনেক পরিবার আছে যারা স্বেচ্ছায় শিশুদের কে টিকা দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। এ কাজের পেছনে অন্যতম কারণ, কোভিড ভ্যাক্সিন নেয়ার পরবর্তী প্রভাবের ফলে দেশের হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন রকম “স্কিন ডিজিজ” এ ভুগেছে। যা সাধারণ মানুষের মনে এক প্রকার ভীতি তৈরি করেছে। এর ফলে অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা বা ভ্যাক্সিনেশন গ্রহণে মানুষের মনে একপ্রকার ভয়,সন্দেহ এবং অনীহা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সরকার হাম পরিস্থিতি থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত এক মাস হাম এর টিকাদান ক্যাম্পেইন কর্মসূচির মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক, স্কুলভিত্তিক বাচ্চাদের হামের টিকা প্রদান নিশ্চিত করছে। এছাড়াও অভিভাবকবৃন্দের মাঝে হামের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। তবে হাসপাতালগুলোর চিত্র এখনো পরিবর্তন হয়নি। সদ্য জন্ম নেয়া শিশু হতে ১০, ১১ বছরের শিশুরাও হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে। অনেক শিশু আছে টিকা নেয়ার সময় হওয়ার আগেই হামে আক্রান্ত হয়ে জীবন-মরণের লড়াই করছে। এছাড়াও আক্রান্ত শিশুর পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবার জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ির করুণ চিত্রেরও সাক্ষী হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রশাসনের হাসপাতালে অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থার পাশাপাশি, শিশু ওয়ার্ডগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেয়ার আবেদন জানাচ্ছি। হামের টিকার নতুন সংযোজন শিগগিরই যুক্ত রাখতে হবে এবং টিকাদান কর্মসূচি জারি রাখতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের হাম রোগের উপরে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরো সচেতন এবং অভিজ্ঞ করে তুলতে হবে। সাধারণ মানুষের মন থেকে টিকার ভয় দূর করতে সরকার বিভিন্ন সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন তৈরীর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এছাড়াও দেশের প্রতিটি স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা যেনো হাম এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজন করে। সেরে উঠুক নবপ্রজন্ম, সেরে উঠুক বাংলাদেশ। 

 

লেখক :

আশা মনি

শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ 
ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/170257