প্রিয় এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে দু’টি কথা

প্রিয় এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে দু’টি কথা

আপনাদের এবং মৌরুশগণের চোখের সামনেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৬৪ সালে টিএমএসএস-এর গোড়াপত্তন হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৮০ সালে তৎকালীন সরকারের অকুন্ঠ ও সর্বত সহযোগিতায় ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ পুনঃযাত্রা শুরু করে। আমি সে সময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিজ হস্তে লিখিত বলিষ্ঠ নির্দেশনায় সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত হয়ে সরকারি মজিবর রহমান মহিলা কলেজে অধ্যাপনা করছিলাম। আমার জীবনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নার্থে এই সংস্থাকে উত্তম এবং উপযোগী ফোরাম গণ্য করে আপনাদের মতো- বিশেষ করে ঠেঙ্গামারা, বারবাকপুর, বাঘোপাড়া, মহিষবাথান, আশোকোলা, গোকুল, শাখারিয়া ইত্যাদি গ্রামের সচেতন, ভবিষ্যৎদর্শী ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় শূন্যে অবস্থান করা টিএমএসএস বর্তমানে সমগ্র বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বাইরেও কাজ করছে। যার মধ্যে অন্যতম ১০০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ক্যান্সার হাসপাতাল, অত্যাধুনিক হার্ট সেন্টার, কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন কেন্দ্র, জে অ্যান্ড জে আই কেয়ার সেন্টার, দাঁতের উন্নত চিকিৎসা ইত্যাদি স্পেশালাইজড চিকিৎসা সেবা ছাড়াও বায়োমলিকুলার ল্যাবরেটরি, যার দ্বারা আপনি এবং আপনার প্রিয়জনের ভবিষ্যতে দেহে কোনো ক্যান্সার হবে কি না, তাও নির্ণয় করা যায়।

স্বাস্থ্য সেবাকে বিশ্বমানের ও সমৃদ্ধ করার জন্য অ্যাভিয়েশন কোম্পানি, ২টি হেলিকপ্টার, মম ইন পাঁচ তারকা হোটেল এবং বিনোদন জগৎ সৃষ্টি করার মুখ্য উদ্দেশ্য- বিনোদন পেয়ে মানুষ উন্নত হবে, সুশিক্ষিত হবে, মানবিক হবে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীগণের মতে, প্রত্যেক মানুষের ব্রেনে ‘সেরোটনিন’ নামক হরমোনের দ্বারা স্বীয় মানুষ জ্ঞানী, গুণী, রোগমুক্ত, দীর্ঘায়ু প্রাপ্ত হয়। আর এ মূল্যবান সেরোটনিন খাদ্য-খানা অপেক্ষা ভালো লাগা এবং বিনোদন পাওয়া থেকে হয়। আমাকে তথা টিএমএসএস’কে বিদ্বেষ করে কেউ যদি বিনোদন পান, সেটাকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখি; কিন্তু এই বিদ্বেষ করে বিনোদন পাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেতিবাচকও হয়- বিবাদ, মামলা-মোকদ্দমা সৃষ্টি হয়। 
৫ই আগস্টের পর পার্শ্ববর্তী বন্ধু দেশ বিরূপ হলে ভারত-নির্ভর রোগীগণ ভারতে যেতে পারে নাই। তারা অনেকেই আমাদের হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা নিয়েছেন, নিচ্ছেন- অতি স্বল্পমূল্যে এবং বিড়ম্বনাবিহীনভাবে। কথায় বলে, “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া।” তাই কেউ কেউ আমাদের বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সেবার হেমাটোলজি বিভাগের বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন নাই। যে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের বাইরে উন্নত দেশে যাওয়া ও লক্ষ-কোটি টাকা খরচ করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না, তা আমরা উত্তরবঙ্গে আমাদের-আপনাদের বগুড়ায় করছি।

১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পূর্বে ১০ই ফেব্রুয়ারি বগুড়ার জাতীয় গৌরব মরহুম শহীদ জিয়াউর রহমানের পুত্র, দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বগুড়ার সন্তান ফোন করে আমাকে যখন বললেন, “আপা, ভোটের ক্ষেত্রে আপনি লক্ষ্য রাখবেন।” আমি বলেছিলাম, “একমাত্র বগুড়া জেলাতেই টিএমএসএস-এর একলক্ষ ছেষট্টি হাজার পরিবার, প্রায় নয় হাজার সমিতি। প্রতি পরিবারে গড় তিনটি করে ভোট থাকলে টিএমএসএস আমব্রেলায় থাকা প্রায় পাঁচ লক্ষ ভোট টিএমএসএস-এর হিতাকাক্সক্ষী প্রার্থীর অনুকূলে যাবে, আপনি চিন্তা করবেন না। শহীদ জিয়াউর রহমানের নামে বগুড়া ব্যাকুল।”

যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, অরাজনৈতিক টিএমএসএস’কে তার সাথে করেসপন্ডিং করতে বাধ্য হতে হয়। তাই কেউ কেউ আমাদেরকে ফ্যাসিস্টের দোসর বলে দোষারোপ করে। এতে কিছু বলার নাই। মানব চরিত্রের নিয়ম- যে যেরকম, অন্যকেও তাই মনে করে। আমাকে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় এবং দেশের বাইরেও যেতে হয়। আমাকে যারা জিজ্ঞেস করেন “টিএমএসএস-এর ফাউন্ডেশন অফিসের অদূরে ইউএনও অফিসের আসবাবপত্র, মূল্যবান ইকুইপমেন্ট লুট হলেও শুধুমাত্র চেয়ার-টেবিলই ফেরৎ দেওয়া হয়েছে, এটা কেন? ইউএনও অফিসের অবকাঠামো, আসবাব এবং ইক্যুইপমেন্টের কি অপরাধ ছিল? সেখানে লুট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হলো কেন? লজ্জায় আমার মাথা হেট হয়। বর্তমান বগুড়াবাসীর জনপ্রিয় সরকারপ্রধান কৃষিভিত্তিক তৃণমূল প্রাধান্য ও মাইক্রো-ইকোনমি জোরদারমূলক কাজ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ফুয়েল কার্ড চালু করেছেন। পরিবেশ উন্নয়নের স্বার্থে বনায়ন; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টু টিএমএসএস এখতিয়ার থেকে বছরে এক কোটি চারা উৎপাদন এবং বনায়ন করার তাগিদ দিয়েছেন। টিএমএসএস এনজিও মালিকানাধীন জমিতে গাছ লাগানো উপযোগী ও যৌক্তিক। এদেশের কৃষককূল জমিতে গাছ লাগালে ফসলের জমি পাবে কোথায়! তাই বিএনপি’র শাসনামলে টিএমএসএস বেশুমার বনায়ন করে যেমন স্বীকৃতি পেয়েছে, পরিবেশের উন্নয়নের জন্য তাদের সবুজায়নের ধারাবাহিকতা চলমান রাখা দরকার।

শিল্পায়ন ছাড়া কর্মসংস্থান তথা চাকরি জোটে না। তাই শিল্পায়ন করতে গিয়ে চাকরির অনুপযুক্ত, অনাগ্রহী ও বিদ্বেষবাদীদের অনেক অর্বাচীন কথা শুনতে হয়। বাংলাদেশের কোন কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানে টিএমএসএস-তুল্য অত্যাধুনিক বিশালাকার ইটিপি আছে, কোন কোন হাসপাতালে টিএমএসএস-তুল্য ইটিপি চলছে- আমাদেরকে জানালে আমরা শিক্ষা নিতাম, সংশোধন হতাম। আমাদেরকে কিছু না জানিয়ে, সংশোধনের সুযোগ, ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ না দিয়ে জেনা-তুল্য গীবতের পাপ করা উচিত নয়। আমরা জাতীয় এবং স্থানীয় সকল পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আমাদের দখলে সরকারি এবং বেসরকারি কার কতটুকু জমি কোথায় আছে, তা শনাক্ত করার অনুরোধ করেছি। পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক যেকোনো ব্যক্তি ৫,০০০/- টাকা জমা দিয়ে সমগ্র টিএমএসএস বা টিএমএসএস-এর অংশবিশেষ অডিট করে আমাদের ভুল ধরিয়ে দিলে ভুল হ্রাস পেত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর চেয়ারকে কেন গরম, কেন আগুন-তুল্য বলেছেন, তা আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি। এই ক্ষুদ্র, জটিল, বহুমুখী কার্যক্রমে রত অর্থ অভাবে প্রত্যেকটি কাজের ক্ষেত্রে যেন ‘কম্বল দ্বারা মাথা ঢাকলে পা বের হয়, পা ঢাকলে মাথা বের হয়’ এমন পরিস্থিতি চলছে। প্রত্যাশাকারীগণের প্রত্যাশা পূরণে অপারগ হই, তাই দায়িত্বশীলদের উপলব্ধি বুঝি। এজন্য প্রত্যেক অকেশনেই সহৃদয়বান ব্যক্তিবর্গের নিকট দান চাহিয়া আবেদন করি এবং প্রাপ্ত দানও যথেষ্ট পাই। তা দিয়েও হাসপাতাল চত্বরে গিয়ে দেখি ঔষধ অভাবে, ইনভেস্টিগেশন অভাবে মানে অর্থ অভাবে অকাতরে মানুষ মারা যাচ্ছে। সেদিন সরকারি কাজে শেরপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গিয়েছিলাম; অর্থাৎ সহকারী অধ্যাপকদের পদোন্নতি কমিটিতে সরকার আমাকে রেখেছেন, যেন কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি না হয়। আমি ভাবলাম, হায় কপাল! টিএমএসএস-এর দুর্নীতি দূরীকরণে আমি হাঁফসে যাচ্ছি অথচ সরকার বাহাদুর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে পছন্দ করেছেন। আমার প্রতিবেশীরা আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে আমাকে সংশোধন না করে, আমার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ করে অহরহ বিনোদন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। অরাজনৈতিক বেসরকারি সংস্থার ব্যবস্থাপনার খাতিরে যখন যে সরকার দায়িত্বে থাকেন, তার দরজায় দরজায় আমাকে ঘুরতে হয়। কিন্তু বিদ্বেষকারীরা মনে করে আমি ব্যক্তিগত স্বার্থে বা ক্ষমতাসীন সরকারের পার্টিতে পদ পাওয়ার জন্য বোধ হয় ঘুরছি। তাই তাদের বাঁকা চোখ, তীর্যক দৃষ্টি; আমাকেই আড়ালে গিয়ে দূরে থেকে তীর মারে।

প্রিয় এলাকাবাসী, পত্রিকায় টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে টিএমএসএস-এর বিনোদন জগৎ এলাকার প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকার কচুরিপানা ১৪ লক্ষ টাকা ব্যয় করে পরিষ্কার করেছি। তৎপর শুধুমাত্র শাখারিয়া বাউলাপাড়া মাঠের নিচের অংশের কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য বাহিরের ঠিকাদারকে আবারও ৬ লক্ষ টাকা দিয়েছি। এই অঞ্চলের যুবজনগোষ্ঠীকে কচুরিপানা পরিষ্কার করে টিএমএসএস থেকে শ্রমের সম্মানী নেওয়ার জন্য বারংবার আহ্বান করেছি, কিন্তু সাড়া পাই নাই। ফলে প্রতি বছরই কচুরিপানাতে করতোয়া নদী হাজামজা হয়ে যায়, কচুরিপানার পচা মোথা দ্বারা পানি পচে যায়, মশা-মাছির জন্ম নেয়। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষবাদীগণ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চলমান ইটিপিযুক্ত পেপারমিলকে দায়ী করে; অথচ পেপারমিলের সন্নিকটে নদীর নির্মল পানিতে নৌকা, কায়াকিং, স্পিডবোট চলছে। যার ভাটিতে বাউলাপাড়া সংলগ্ন নদী জলেশ্বরীতে চাপা, দূষিত পানি। স্বেচ্ছাশ্রমে এই জলেশ্বরী/কচুরিপানা পরিষ্কারের প্রস্তাবেই সাবেক চেয়ারম্যান হাসান জাহিদ হেলালকে ফোন দিয়েছিলাম। তাতে নাকি কেউ কেউ উল্লসিত হয়েছে যে আমি ভয় পেয়ে গেছি। ভয় আমার নাই- তা নয়; তবে ভয় থেকে ভক্তি বেশি আছে। উন্নয়নের জন্য, অর্জনের জন্য ও বিদ্বেষ বর্জনের জন্য আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। মনে রাখবেন, হিংসার তুল্য পাপ নাই, দয়ার তুল্য ধর্ম নাই। ফরজে আইনের ‘হক্কুল্লাহ্’ পালনের জন্য যেমন মসজিদ দরকার, তেমনি ফরজে আইনের ‘হক্কুল ইবাদ’ পালনের জন্য শিল্প কারখানা, ক্ষেত-খামার, হাসপাতাল-ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-গাড়িয়া ইত্যাদিতে পানি থাকা এবং কর্মসংস্থান হওয়া দরকার। হক্কুল্লাহ্ ব্যত্যয় হলে কাযা আদায় করা যায়, মহান আল্লাহ মাফও করেন, কিন্তু হক্কুল ইবাদ ব্যত্যয় হলে, কাযা হলে আল্লাহ মাফ করবেন না। তা কাযা আদায় করা খুবই জটিল ও কঠিন। সাধু সাবধান!

লেখক:

অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম

প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস।
ইমেইল: es@tmss-bd.org
০২৫৮৮৮৭৭৩০৫-৯ (অফিস)

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/169994