ধর্ষণ মহামারী আদৌ কি বন্ধ হবে
ধর্ষণ বাড়ছে, বাড়ছে ধর্ষণের পর হত্যাও। একই সঙ্গে বাড়ছে নিষ্ঠুরতা। খবরের কাগজ খুললেই এখন চোখে পড়ে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা, যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। সমাজের আনাচকানাচে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে। নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সব সময়। ধর্ষণের মতো বিপদ যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না আমাদের। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো এসব ঘটনার বেশিরভাগেরই সঠিক বিচার হয় না। প্রশ্ন উঠছে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই কি ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্ভব, নাকি প্রয়োজন এর বাস্তবায়ন ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন? সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, কর্মহীনতা, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা, পর্ণোগ্রাফির অবাধ প্রসার; সর্বোপরি নারীর প্রতি পুরুষের হীন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা।
বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি ধর্ষণকে আরও উৎসাহিত করছে, অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, আর ভুক্তভোগীরা পাচ্ছে না ন্যায়বিচার। বাংলাদেশে ধর্ষণ-সংক্রান্ত মামলার বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। কথায় আছে, ‘জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড’। এ ছাড়াও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব থাকার কারণে তারা শাস্তি এড়াতে সক্ষম হয়। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধীদের উৎসাহিত করে এবং সমাজে একটি বার্তা পাঠায় ধর্ষণ করেও পার পাওয়া সম্ভব। ফলে ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতরা হয়ে পড়ছে অপ্রতিরোধ্য। শিশু থেকে কিশোরী, যুবতী থেকে বৃদ্ধা, স্কুল ছাত্রী থেকে পোশাককর্মী, ডাক্তার, আইনজীবী এমন কি ভিখারিনীও রেহাই পাচ্ছে না মানুষরূপী এসব হায়েনাদের হিংস্র থাবা থেকে। ধর্ষকরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত থাকছে না, ঘটনা ধামাচাপা দিতে ঘটাচ্ছে নৃশংস হত্যাকান্ড।
একাধিক সংস্থার হিসাবে গত ছয় বছরের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে যতটি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে গত ৬ মাসেই তা ছাড়িয়ে গেছে। সে হিসাবে এ ভয়াবহ অপরাধ এখন দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। ধর্ষিতাদের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ হচ্ছে, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন হচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে। মিছিলে স্লোগান উঠছে, অপরাধীর ফাঁসি চাই। আল্টিমেটাম দেওয়া হচ্ছে কখনো ৪৮ ঘণ্টার, কখনো আবার তিন দিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত। পরে অন্য ঘটনার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে পুরনো সব ঘটনা।
ধর্ষন প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। ধর্ষকের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ধর্ষণ রুখে দিতে প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকার গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, প্রতিটি পরিবারে যেমন কন্যা সন্তান আছে, তেমনি ধর্ষকরাও কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান। তাই ধর্ষণের মতো সামাজিক মরণব্যাধি নির্মূলে প্রতিটি পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নারীদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি মিডিয়াতে এ ধরনের ঘটনা প্রচারে আরো কৌশলী হতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, ঘটনার সঠিক অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সমাজ গড়ে তুলতে হলে শুধু ধর্ষকদের শাস্তি দিলেই হবে না, বরং ধর্ষণের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার পথগুলোও চিরতরে বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ তখনই কমবে, যখন অপরাধীরা বুঝবে যে তারা শাস্তি এড়াতে পারবে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন ধর্ষণ বন্ধ হবে না। তাই এখনই সময় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি নিরাপদ সমাজে বড় হতে পারে। বিচারহীনতার এই অন্ধকার থেকে মুক্তি না পেলে আমরা কেউ-ই নিরাপদ নই।
লেখক :
মিশকাতুল ইসলাম মুমু
শিক্ষার্থী, গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।