দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে দিশেহারা মানুষ

দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে দিশেহারা মানুষ

ঈদ বা উৎসবের সময় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। কেন বাড়ে, সে জন্য কোন যুক্তিযুক্ত কারণের দরকার পড়ে না। স্বদেশের কোটি কোটি মানুষ কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। মধ্যবিত্তের অবস্থা সঙ্গীন। নিম্নবিত্ত বা গরিব মানুষ রীতিমতো যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। এই অবস্থার উন্নতির কোন লক্ষণ দেখতে না পেয়ে মানুষ তীব্র হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত। মানুষের হতাশা ক্ষোভ ও অস্থিরতা বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য। মানুষ দিশেহারা। মানুষ চিন্তিত।  বদলে যাচ্ছে, বিবর্ণ হচ্ছে মধ্যবিত্ত। লুপ্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত। সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী টাউট, ঘুষখোর প্রশাসন, নির্মম এনজিও মহাজনদের লাগাতার উৎপাত সহ্য করে বেঁচে আছে ইতিহাসের সবচেয়ে টেকসই জনগোষ্ঠী মধ্যবিত্ত। একের পর এক সঙ্কটে নাকাল হচ্ছে গণমানুষ মানে বিত্তহীন ও মধ্যবিত্ত। বাজারে স্বস্তির ছিটেফোঁটাও যেন নেই দ্রব্যমূল্য লাগামহীনভাবে বাড়ছে। ১ মাস আগে  বাজার করতে মানুষের ৫০০ টাকা খরচ হতো সেই জিনিস গুলো এখন কিনতে খরচ ৭০০ টাকা। কিন্তু সিন্ডিকেটের দাপটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রির দাম বেড়েই সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্বীকার করে তো আরেকবার বলে সিন্ডিকেট নেই। সরকারের এই দোদুল্যমান সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেট আরো জাঁকিয়ে বসে জাতির ঘাড়ে।

দীর্ঘদিন ধরেই বাজারে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা। খোঁড়া যুক্তিতে ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাড়তি দাম আদায় করছে ক্রেতাদের কাছ থেকে। ফলে দ্রব্যমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারের মনিটরিং সেলের কোনো ভূমিকা না থাকায় ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব দ্রব্যের দাম। দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ব্যবসায়ীদের হাতে। যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকলেও তারা যে কোন অজুহাতে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণে অকারণে দাম বাড়ালেও পরবর্তীতে একমাত্র শাক সবজি ছাড়া অন্যান্য পণ্যের দাম খুব একটা কমার নজির নেই। কোনও কারণ ছাড়াই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। সকালে একদাম তো বিকালে আরেক ডিমের হালি যখন ৫০ টাকা ছুঁয়ে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, ঠিক তখনই উত্তাপ ছড়াচ্ছে পেঁয়াজ ও আদার বাজার। এর ওপর দীর্ঘ এক মাস ধরে চড়া সবজির বাজার তো আছেই-সামান্য বৃষ্টি হলেই যা আরো আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। সংকটের এই মিছিলে চলতি সপ্তাহে নতুন করে যোগ দিয়েছে পেঁয়াজ ও আদা। মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা বাড়লেও, আদার বাজার আরো বেসামাল। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি আদা ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘাঁ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মুরগির দামে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি দরে। আর সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি দেখা গেছে দেশি মুরগির দামে। বর্তমানে এক কেজি দেশি মুরগির জন্য ক্রেতাকে খরচ করতে হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। অন্যদিকে, মধ্যবিত্তের পছন্দের সোনালি মুরগি বাজারভেদে ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। সব মিলিয়ে ছুটির দিনে বাজারে এসে আমিষের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।  বেশ কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করেই মূলত পেঁয়াজ ও আদার এই দরবৃদ্ধি। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়, যা মাত্র এক সপ্তাহ আগেও ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। তবে বাজারে প্রচুর পরিমাণে দেশি রসুনের সরবরাহ থাকায় এ পণ্যটির দাম আছে আগের মতোই।ব্যবসায়ীদের মতে, পেঁয়াজের দাম কিছুটা বাড়লেও পণ্যটি এখনো সবার নাগালের মধ্যে আছে। তবে বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে দাম বাড়ানোর সুযোগ নিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। কারণ, কৃষকের হাত থেকে পেঁয়াজ এখন বড় ব্যবসায়ীদের গুদামে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খুচরা বিক্রেতা জানান, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি বাজারে প্রতিদিন পেঁয়াজের দাম কেজিতে এক-দুই টাকা করে বাড়ছে।

এদিকে, বাজারে এখন ৭০-৮০ টাকা কেজির কমে কোনো সবজি মিলছে না। সবচেয়ে কম দামের সবজি পেঁপের দাম এখন ৬০ থেকে ৮০ টাকা। আর মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। অন্যান্য সবজির মধ্যে ঢ্যাঁড়স, চিচিঙ্গা, ধুন্দল ও ঝিঙে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। করলা, বরবটি, কাকরোল দাম আরও বেশি, বাজারে যা ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে মিলছে। ঈদকে সামনে রেখে মসলার বাজার এখন অস্থির। কালো এলাচ, গুলমরিচ, লং, জায়ফল, দারুচিনি, জিরার মূল্য এখন আকাশচূম্বি। বাজারের এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আরও চাপে পড়েছে। তদারকি জোরদার না হলে ঈদের আগে বাজার আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ ক্রেতারা।

সরকার যেহেতু পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে আগেভাগেই সচেতন হয়েছে সে জন্য তাদের কাছে বাড়তি কিছু ভূমিকা প্রত্যাশা করা যেতেই পারে। তাদের দুটি কাজ হবে, বাজারে নজরদারি বাড়ানো এবং অতিমাত্রায় মুনাফা হাতিয়ে নিয়ে যারা জনগণের পকেট খালি করে দিতে চায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ। তাদের জন্য আরেকটি কাজও গুরুত্বপূর্ণ-সরবরাহ লাইন ঠিকঠাক রাখা। শুধু পথের ব্যবস্থা যথাযথ রাখা নয়, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও সক্রিয় থাকতে হবে। পণ্যমূল্য স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনেরও ভূমিকা প্রত্যাশিত। পৃথিবীর সব দেশে উৎসব আর এবাদতকে কেন্দ্র করে জিনিস পত্রের দাম কমে। আমাদের দেশে উল্টা উৎসব ত্যাগের মহিমা কে কেন্দ্র করে দাম বাড়ে লাগামহীন ভাবে।

 

মাহমুদ হোসেন পিন্টু

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/169783