কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ঈদের আনন্দ নাকি পরিবেশের দুঃখ
ঈদুল আজহা আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কৃতির এমন এক উৎসব, যেখানে আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ব আর হৃদয়ের প্রশান্তি। কোরবানির পর পরিবারে পরিবারে জমে ওঠে উৎসবের ব্যস্ততা, অতিথি আপ্যায়ন, রান্নাঘরে সুগন্ধ। কিন্তু এই আনন্দের বিপরীতে শহরের রাস্তায় রাস্তায় যেন দেখা দেয় আরেকটি ভিন্ন দৃশ্য দুর্গন্ধ, রক্তাক্ত পানি, এবং বর্জ্যের ভারে নুয়ে পড়া পরিবেশ। এই বৈপরীত্য আমাদেরকে প্রতি বছর একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: কোরবানির আনন্দ কি সত্যিই সবার? নাকি কোনো কোনো মানুষের জন্য তা নিছক পরিবেশের দুঃখে পরিণত হয়?
বছর ঘুরে একই চিত্র। ঈদের আগের দিন গরুর হাটে মানুষের ঢল, দামাদামি, উচ্ছ্বাস এ যেন উৎসবেরই অংশ। কিন্তু কোরবানির দিন দুপুর গড়াতেই শহরের বাস্তবতা একেবারে পাল্টে যায়। মাংস ভাগাভাগির আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে, আর ঠিক তার পাশেই রাস্তায় পড়ে থাকে অন্ত্র, হাড়, চামড়া, রক্তমাখা পানি যা দেখে মনে হয় কেউ যেন পূর্বপরিকল্পনা করেই শহরকে অস্থায়ীভাবে অসুস্থ করে রেখেছে।
অনেকেই বলেন শহর তো আর গ্রাম নয়, এখানে স্থান সংকুলান নেই। কথাটা ঠিক, কিন্তু এও সত্য যে লাখো মানুষ যখন একই দিনে পশু কোরবানি দেয়, তখন সেই বিপুল বর্জ্য এক জায়গায় জমা হওয়ার আগেই নাগরিক জীবনে বিরাট চাপ তৈরি হয়। বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই রাস্তাজুড়ে রক্তমিশ্রিত পানি নালা দিয়ে না নেমে উল্টো ঘরের আঙিনায় ঢুকে যাওয়ার উদাহরণও নতুন নয়। তখন ঈদের উৎসব ধীরে ধীরে বাসিন্দাদের কাছে ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় স্বাস্থ্যগত। বর্জ্য যতক্ষণ পড়ে থাকে, তত দ্রুত সেখানে জন্ম নেয় মাছি, ব্যাকটেরিয়া, রোগজীবাণু। শিশুদের জন্য এই সময়টা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ। যেটা কোরবানির আনন্দ অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে তখন তা জনস্বাস্থ্যের হুমকিতে পরিণত হয়। অথচ একটু দূরদর্শিতা থাকলে এই বিপর্যয় অনেকটাই কমানো সম্ভব। শহরের যেসব জায়গায় কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট স্পট রাখা হয়, সেখানে তুলনামূলকভাবে বিশৃঙ্খলা কম দেখা যায়। সেখানে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সময়মতো এসে বর্জ্য তুলে নেয়, পানি ঢেলে জায়গা পরিষ্কার করে। কিন্তু সমস্যা হলো এই উদ্যোগগুলো এখনও কতিপয় এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ মানুষ নিজের গলিতেই কোরবানি দিতে অভ্যস্ত; জায়গা কম হলেও সেটা বদলাতে চান না। কোরবানির জায়গাকে পরিষ্কার রাখা যে ধর্মীয় শিষ্টাচারেরই অংশ এটা বহু লোক জানেন না, বা জানলেও গুরুত্ব দেন না। আরও বড় সমস্যা হলো পরিকল্পনার অভাব। ঈদের আগের সপ্তাহে গণমাধ্যম, সিটি করপোরেশন বা স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্যোগে যদি বাড়ি-বাড়ি সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া যায় যেমন কোথায় বর্জ্য ফেলতে হবে, কীভাবে ব্যাগে বেঁধে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট সময়ে কীভাবে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে তাহলে অনেক অস্বস্তি এড়ানো যেত। অনেক দেশের মতো একটি ঈদ-স্পেশাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ থাকলেও মানুষ উপকৃত হতো। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন স্মার্টফোন ব্যবহারের চেয়ে এসব ক্ষেত্রে আমরা এখনও অতটা স্মার্ট নই। তবে দোষ শুধু নাগরিকের নয়; প্রশাসনিক কাঠামোও অনেক সময় দুর্বল হয়। পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সংখ্যা কম, যন্ত্রপাতি সীমিত, আবার কোথাও কোথাও বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট জায়গাই নেই। ফলে কর্মীরা সব চেষ্টার পরেও চাপ সামলাতে হিমশিম খায়। অনেক সময় তারা জানান মানুষ যদি অন্তত ব্যাগে বেঁধে দিত, তাহলে তুলতে সুবিধা হতো। অথচ আমরা অনেকেই বর্জ্য এমনভাবে ফেলে রাখি, যেন তা পরিষ্কার করা অন্য কারও দায়িত্ব, আমাদের নয়।
এখন প্রশ্ন সমাধান কোথায়? প্রথমত, নির্দিষ্ট কোরবানি স্পট বাড়াতে হবে এবং সেগুলোতে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পূর্বপরিকল্পিত বর্জ্য সংগ্রহ দল তৈরি করতে হবে যারা ঈদের দিন সকাল থেকেই নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করবে। তৃতীয়ত, নাগরিক সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যত সেলফি কিংবা পশুর ছবি পোস্ট করি তার এক শতাংশ শক্তি যদি পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ব্যবহার করি, তবে পুরো রাস্তাই বদলে যেতে পারে। চতুর্থত, পরিবেশবান্ধব ডাস্টব্যাগ বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এটা অনেক শহরে নিয়ম, আমাদের দেশেও চালু করা যায়। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা জরুরি কোরবানি শুধু পশু জবাই নয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বার্তাটা যত ছড়াবে, মানুষ তত দায়িত্বশীল হবে। ঈদ আমাদের হৃদয়কে আনন্দে ভরিয়ে তোলে এটা আমাদের সম্মিলিত উৎসব। কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় দুর্গন্ধ, দূষণ এবং বর্জ্যের স্তুপ দেখলে মনে হয় আমরা যেন আমাদের আনন্দকে অন্যের কষ্টের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছি। ঈদের সত্যিকারের সৌন্দর্য তখনই ফুটে উঠবে, যখন সেই আনন্দ পরিবেশের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করবে না। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু একজনের নয় এটা সবার অধিকার। আর ঈদের আনন্দও তেমনি এটা কোনো পরিবার বা কোনো গলির নয়; পুরো সমাজের। তাই দায়িত্বও আমাদের সকলের। এই শহরটা আমাদেরই ঈদের দিনটাও আমাদের। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের আমরা আনন্দ রাখব, নাকি পরিবেশকে দুঃখ দিয়ে যাব?
লেখক :
আরশী আক্তার সানী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা