অর্থনৈতিক উন্নয়নে তারেক রহমানের উদ্যোগ প্রশংসনীয়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এমন এক অর্থনীতির দায়িত্ব নিয়েছে, যা ভঙ্গুর এবং এখনো বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আশঙ্কাজনক ভাবে কমে যাওয়ায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে প্রবেশ করে। এরপর থেকে আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। আগের অন্তর্বর্তী সরকার আশা করেছিল, আন্তর্জাতিক সদিচ্ছায় হয়তো ঋণ আলোচনা সহজ হবে। কিন্তু ঋণদাতারা তাদের শর্তে অনড় ছিল। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় কিস্তি আটকে গিয়েছিল, আবার কঠোর শর্ত মানার পর তা ছাড় হয়েছে। একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম এক মাসে অনেক সময় ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার সূচনা করে। এই সময়ের সিদ্ধান্ত, আচরণ এবং নীতিগত বার্তাগুলো শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়, বরং জনগণের মনোজগতেও সরকারের একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। নতুন সরকারের প্রতি মানুষের আশা যেমন থাকে, তেমনি থাকে সতর্ক পর্যবেক্ষণও। সরকার কোন পথে হাঁটছে, কাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম এক মাস বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে। যেমন- প্রশাসনে গতি ফিরিয়ে আনা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলোর অনেকগুলোই ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, আবার কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। তবুও সামগ্রিকভাবে বলা যায়-প্রথম এক মাসের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা তৈরির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন। দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত এই মানুষেরা দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন, কিন্তু তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সম্মানীর বিষয়টি সব সময়ই আলোচনায় থেকেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার মাধ্যমে ধর্মীয় সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের একটি প্রতীকী স্বীকৃতি দিয়েছেন।
এ উদ্যোগ শুধু একটি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি নয়; বরং এটি সামাজিক মর্যাদা ও দায়িত্ববোধেরও একটি বার্তা বহন করে। মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা গ্রামীণ ও নগর সমাজে নৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল সম্মানী ব্যবস্থা চালু করা রাষ্ট্রের সামাজিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই কর্মসূচির পাশাপাশি গত এক মাসে সরকারের আরো কিছু উদ্যোগ মানুষের নজর কেড়েছে। প্রশাসনিক সরলতা আনার চেষ্টা, সরকারি অফিসে সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তববাদী অবস্থানের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড এবং স্বাস্থ্যসেবা ডিজিটাল করার পরিকল্পনা সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের একটি ইঙ্গিত দেয়। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কারের কিছু উদ্যোগও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি অফিসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সেবা দ্রুত দেওয়ার উদ্যোগ প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
আইন-শৃঙ্খলা খাতেও কাঠামোগত পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। জনবান্ধব পুলিশ গঠন, আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ভবিষ্যতে একটি কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করার পর প্রতিষ্ঠানটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে, ফলে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি জনমনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সম্ভাব্য নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন এর নাম আলোচনায় এসেছে। বিচারিক জীবনে তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সাহসিকতার কারণে অনেকেই মনে করেন তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের একটি স্পষ্ট বার্তা পাওয়া গেছে-জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। সবার আগে বাংলাদেশ নীতির এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বাস্তববাদী অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি কিছু বিতর্কও সামনে এসেছে। প্রশাসনিক পর্যায়ে কিছু অপসারণ ও বদলির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের প্রশ্নও অনেক সময় আলোচনায় এসেছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ধরনের বিতর্ক অস্বাভাবিক নয়। বরং অনেক সময় এসব বিতর্কই সরকারকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই বিতর্কগুলো যেন ইতিবাচক উদ্যোগের মূল বার্তাকে দুর্বল করে না দেয়।
সব মিলিয়ে গত এক মাসের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। সরকার কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে-সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক সরলতার চেষ্টা এবং রাজনৈতিক সৌজন্যের বার্তা দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ জনমনে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশাসনিক অপসারণ, কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার অভিযোগ সেই ইতিবাচক বার্তাকে আংশিকভাবে দুর্বল করার ঝুঁকিও তৈরি করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে পরিবর্তনের কথা বলছেন, সেই পরিবর্তন বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রশাসনে ন্যায়বিচার, পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বে নয়; বরং তার প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও নিহিত থাকে। তাই সৎ, দক্ষ ও নীতিবান কর্মকর্তাদের ওপরই একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নির্ভর করে। তারা যদি স্বাধীনভাবে এবং ন্যায়বোধের সঙ্গে কাজ করতে পারেন, তবে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সত্যিকারের পরিবর্তন কখনো শুধু রাজনৈতিক ভাষণে প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে, প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে এবং নীতিনির্ধারণের প্রতিটি ধাপে। জনগণ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে। সেই পরিবর্তনের পথ সহজ নয়; কিন্তু সঠিক নীতি, সুশাসন এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনের মাধ্যমে সেই পথ নির্মাণ করা মোটেও অসম্ভব নয়। নতুন সরকারের প্রথম এক মাস সেই সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিত দিয়েছে। কিšুÍ শিল্প ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি কঠিন। তৈরি পোশাক খাতের অনেক কারখানা বন্ধ। রপ্তানির ৮০ শতাংশ এক খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১৩ শতাংশের বেশি। প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ নতুন কর্মপ্রার্থী শ্রমবাজারে আসেন।
কিন্তু জিডিপি বাড়লেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান হচ্ছে না। জ্বালানি খাতও সংকটপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও ব্যয় বেশি। আমদানির ওপর নির্ভরতা ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি ভর্তুকি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো মাত্র ৫ শতাংশের নিচে। বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রধান রপ্তানি বাজার। আঞ্চলিক বাণিজ্যে ভারত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বড় অবকাঠামো নির্মাণে চীনের ভূমিকা আছে। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে নতুন বাণিজ্যচুক্তি ও বাজার বহুমুখীকরণ অপরিহার্য। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি,দুর্বল ব্যাংক খাত, নিম্ন রাজস্ব ও অপ্রতুল কর্মসংস্থানের চাপে আছে। প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ও রিজার্ভের উন্নতিতে কিছু সম্ভাবনার সংকেত দেখা যাচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক ম্যান্ডেটের জন্য দৃশ্যমান সংস্কার ও কার্যকর নীতি দরকার। যেহেতু ২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতি জটিল অবস্থায় আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের সমস্যা, বিনিয়োগ সমস্যা ও জ্বালানি সংকট- সব মিলিয়ে নতুন সরকার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। সরকারকে এখন এসব সমস্যা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। সেই সঙ্গে সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এখন দেখার বিষয় হলো এই সূচনাকে কতটা ধারাবাহিক ও টেকসই করে তুলতে পারে তারেক রহমানের সরকার।
লেখক:
রায়হান আহমেদ তপাদার
গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/169149