রহিমা বেগমের শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্প

রহিমা বেগমের শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্প

নিজের আলোয় ডেস্ক : ইডেন কলেজ থেকে ভূগোলে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে শুরু করেছিলেন শিক্ষকতা। কিন্তু ভাগ্য তাকে টেনে নিয়ে এলো ব্যবসার কঠিন চ্যালেঞ্জে। আজ তিনি সাভারের এক নামকরা রেস্টুরেন্ট ‘তন্দুরী নাইটস’-এর সফল কর্ণধার। অদম্য নারী উদ্যোক্তা রহিমা বেগমের গল্পটি এমনই। সাধারণ এক গৃহিণী কিংবা শিক্ষক থেকে আজ তিনি সাভারের ব্যবসায়ী মহলে এক অনুকরণীয় নাম। 

রহিমা বেগম কখনো ভাবেননি তিনি ব্যবসায় নামবেন। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় তার স্বামী মামুন লন্ডন থেকে ‘ফুড অ্যান্ড হাইজিন’ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরেন। দেশের টানে বড় বড় চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মামুন সাভারের থানা রোডে শুরু করেন ‘লন্ডনাস’ নামের একটি রেস্টুরেন্ট। স্বামীর এই নতুন পথচলায় রহিমা বেগম কেবল স্ত্রী হিসেবে নয়, একজন সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে দাঁড়ান। কঠিন সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা শুরুর দিনগুলো ছিল চরম সংগ্রামের। স্বামীর ব্যবসায় সাহায্য করতে গিয়ে রহিমা বেগম রান্নাবান্না থেকে শুরু করে থালা-বাসন মাজা কিংবা বাথরুম পরিষ্কার করার কাজও নিজ হাতে করেছেন। প্রতিদিন ভোর ৬টায় রেস্টুরেন্ট খোলা থেকে শুরু করে রাত ১২টায় বন্ধ করা পর্যন্ত সব কাজেই ছিল তার সরব উপস্থিতি। মাত্র ৩ জন কর্মচারী নিয়ে শুরু হওয়া সেই ছোট কাজ থেকেই রহিমার মনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা নিয়ে এক গভীর ভালোবাসা ও আকাঙ্খা তৈরি হয়। 

স্বামীর অনুপ্রেরণা ও নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে ২০১৭ সালের মহান স্বাধীনতা দিবসে রহিমা বেগম গড়ে তোলেন নিজস্ব রেস্টুরেন্ট ‘তন্দুরী নাইটস’। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজের পাশে বিসমিল্লাহ টাওয়ারের দোতলায় অবস্থিত এই রেস্টুরেন্টটি শুরু থেকেই আধুনিকতা ও পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেয়। বিশেষ করে এর অন্দরসজ্জায় লাল-সবুজের ব্যবহার তাদের প্রগাঢ় দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। রহিমা বেগম মনে করেন, খাবার কেবল পেট ভরের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আভিজাত্যের পরিচয়। তাই ‘তন্দুরী নাইটস’-এ তিনি খাবারের স্বাদ ও স্বাস্থ্যের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, “মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্যের সাথে স্বাস্থ্য ও পরিতৃপ্তির সম্পর্ক রয়েছে। তাই এর পবিত্রতা নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য।” 

তার ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার আরেকটি বড় দিক হলো ‘পরিবারবান্ধব প্যাকেজ’। ২০১৭ সালে মাত্র ৯০ টাকায় শুরু করা প্যাকেজটি মুদ্রাস্ফীতির এই সময়েও তিনি মাত্র ১২০ টাকায় ধরে রেখেছেন, যাতে সাধারণ মানুষ সাধ্যের মধ্যে আভিজাত্যের স্বাদ নিতে পারে। তার এই উদ্যোগের ফলেই আজ সাভারের থানা রোড এলাকায় গত কয়েক বছরে প্রায় ৩০টি নতুন রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে, যা এই অঞ্চলে একটি নতুন ব্যবসায়িক বিপ্লব ঘটিয়েছে। পরিবার ও নারীর ক্ষমতায়ন রহিমা বেগমের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো তার পুরো পরিবারকে এই ব্যবসার মাধ্যমে একসূত্রে গাঁথা। বর্তমানে পরিবারের সবাই এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত, যা তাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার পাশাপাশি সবার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। ব্যক্তি জীবনে এক কন্যা সন্তানের এই জননী এখন সাভারের শত শত নারীর কাছে এক অনুপ্রেরণার মডেল। রহিমা বেগমের এই পথচলা প্রমাণ করে যে, নিষ্ঠা আর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো বাধা জয় করা সম্ভব। তার মতো উদ্যোক্তারা যত বেশি সামনে আসবেন, দেশের অর্থনীতির চাকা তত বেশি সচল হবে এবং নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তব রূপ পাবে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/169035