কেন আমিরাতকেই অন্যতম শত্রু ভাবছে ইরান?

কেন আমিরাতকেই অন্যতম শত্রু ভাবছে ইরান?

আন্তর্জাতিস ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেহরানের পক্ষ থেকে আবু ধাবিকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দুবাই এবং ফুজাইরাহ বন্দরে ড্রোন হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর এই সম্পর্ক এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইরানের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে সাধারণ কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয় বরং তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক এবং গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।

ইরানের নীতি নির্ধারক ও সামরিক কমান্ডারদের কণ্ঠে এখন সরাসরি যুদ্ধের সুর শোনা যাচ্ছে। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য আলি খেজরিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান এখন থেকে আমিরাতকে আর প্রতিবেশী নয় বরং শত্রুর আস্তানা হিসেবে বিবেচনা করবে। ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, আমিরাতের ভূমি এবং আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানের তেল স্থাপনা ও কৌশলগত বন্দরে হামলা চালানো হচ্ছে। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত আসলে এর পাল্টা জবাব হিসেবে আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোতে কঠোর আঘাত হানা হবে।

দুই দেশের এই শত্রুতার মূলে রয়েছে ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম চুক্তি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে আমিরাত। ইরান শুরু থেকেই এই চুক্তিকে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। ইরানের শঙ্কা, এই চুক্তির আড়ালে ইসরায়েল এখন সরাসরি ইরানের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে। বিশেষ করে আমিরাতে ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা 'আয়রন ডোম' এবং অত্যাধুনিক রাডার স্থাপন তেহরানকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

আমিরাতের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরাহ বন্দর এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, এই বন্দরটি এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত যা আদতে ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন। এর ফলে ওই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজ ও কার্যক্রম ইরানের আইনের অধীনে আসা উচিত বলে তারা মনে করে। মে মাসের শুরুতে ফুজাইরাহ বন্দরে বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও ইরান এতে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে, যদিও তাদের সংবাদমাধ্যমগুলো একে আমিরাতের কৃতকর্মের ফল হিসেবে প্রচার করছে।

সংঘাতের প্রভাব কেবল সামরিক হুমকিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সরাসরি বাণিজ্যিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। দুবাই ও আবুধাবি কর্তৃপক্ষ দেশটিতে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসরত অনেক ইরানি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে এবং অসংখ্য ইরানি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে ইরান বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। এতদিন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান তাদের প্রয়োজনীয় আমদানির একটি বড় অংশ আমিরাতের বন্দর ব্যবহার করে সম্পন্ন করত। এখন সেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরান পাকিস্তান, ইরাক ও তুরস্কের স্থলপথের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে আমিরাতের সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়েও নানা জল্পনা ডালপালা মেলছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের কিশ দ্বীপে একটি পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনায় এবং লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগারে হামলার ঘটনায় আমিরাতের অত্যাধুনিক মিরাজ এবং এফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। যদিও আমিরাত সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের প্রতিরক্ষা নীতি সম্পূর্ণ সার্বভৌম। তবে ইরানের গণমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে যে, আমিরাতি যুদ্ধবিমানগুলো তাদের শনাক্তকরণ নম্বর মুছে ফেলে গোপনে ইরানের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ করছে।

 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/168847