বগুড়ায় স্থবির পথ কুকুরের গণটিকাদান কার্যক্রম : বাড়ছে জলাতঙ্কে মৃত্যু
স্টাফ রিপোর্টার : সারাদেশসহ বগুড়াতেও ২০২১ সালের পর থেকে পথ কুকুরদের গণটিকাদান ‘ম্যাস ডগ ভ্যাকসিনেশন’ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। যথাযথ টিকাদান ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়মিত না হওয়ায় একদিকে যেমন বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সংক্রমণের ঝুঁকিও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পের কার্যকারিতা না থাকায় কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কর্মসূচি বন্ধ আছে। এতে দীর্ঘদিন জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা কম থাকলেও তা আবারও বাড়ছে। টিকা কার্যক্রমের এই স্থবিরতা ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্কমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জাতীয় লক্ষ্যমাত্রাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এদিকে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্রে বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলাসহ আশেপাশের জেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে ও আঁচড়ে আহত নতুন-পুরাতন মিলে ১৫০-২০০ রোগী জলাতঙ্ক প্রতিরোধী এন্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন নিতে আসেন। দিন দিন এই সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে জানান টিকাদান কেন্দ্র সূত্র।
সেখানেই কথা হয় বগুড়ার বৃন্দাবনপাড়ার স্কুলছাত্র সুমনের সাথে। মা সুলতানার সাথে এসেছেন টিকা দেয়ার জন্য। সমুন জানায়, সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ময়লা ফেলার জায়গাতে কয়েকটি কুকুর মারামারি করছিল। এর মধ্যেই একটা কুকুর এসে তার পায়ে কামড় দেয়। ভয়ে দৌড় দেওয়ার পর কুকুরটিও তার পেছনে ছুটে আসে। এতে সে আরও ভয় পেয়ে যায়।
মা সুলতানা বলেন, প্রতিটি এলাকায় কুকুর বেড়ে গেছে। শিশুদের একা ছাড়ায় যায় না। এর একটা প্রতিকার হওয়া উচিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে দেশে একটি সমন্বিত কর্মসূচি চালু ছিল। এতে কুকুরকে টিকাদান, জন্মনিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা সবক’টি বিষয় একসঙ্গে পরিচালিত হতো।
এই কর্মসূচির আওতায় বগুড়াসহ দেশের ৬০টির বেশি জেলায় প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে জলাতঙ্কপ্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে। ৬৪ জেলায় প্রথম রাউন্ড, ৪৬ জেলায় দ্বিতীয় রাউন্ড এবং ৮ জেলায় তৃতীয় রাউন্ড টিকাদান সম্পন্ন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো এলাকায় টানা তিন বছর অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকা দেওয়া গেলে সেই এলাকা কার্যত জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই কর্মসূচি কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থ বরাদ্দ না থাকায় নতুন করে টিকাদান বা জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। ফলে দ্রুত টিকা না পাওয়া কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে। আর এসব কুকুর জলাতঙ্ক সংক্রমণের বড় উৎস।
এদিকে কুকর নিধন ও টিকাদানের বিষয়ে বগুড়া সাবেক পৌরসভার সচিব আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, বগুড়ায় মোট কত বেওয়ারিশ কুকুর আছে তার সঠিক তথ্য নেই। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবং সরকারি নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত কুকুর নিধনে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। পরবর্তীতে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ২০২১ সালে পৌর এলাকার কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক ভ্যাকসিন বা টিকা দেওয়া হয়েছিল। এখন তাও বন্ধ রয়েছে।
কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়া বন্ধ থাকার বিষয়টি বগুড়া জেলা সহকারী প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাছরিন পারভীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকাসহ অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে বগুড়া পৌরসভা। আমরা শুধু টেকনিক্যাল সার্পোট (কারিগরি সহায়তা) ও জনবল দিয়ে থাকি। ম্যাস ডগ ভ্যাকসিনেশন প্রকল্পটি বর্তমানে বন্ধ আছে। হাইকোর্টে নিষধাজ্ঞার জন্য বেশ কয়েক বছর হলো কুকুর নিধনও বন্ধ আছে। পথ কুকুরকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনা গেলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট এলাকার অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টানা তিন বছর টিকা দিতে পারলে এলাকাটি জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব। বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে এই লক্ষ্যেই কাজ চলছিল, যার ফলে এক সময় দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যুহার ৯০ শতাংশের বেশি কমে এসেছিল। তবে ২০২১ সালের পর থেকে অর্থ বরাদ্দ ও নীতিনির্ধারণী পরিবর্তনের কারণে এই কর্মসূচি আর আগের গতিতে চলেনি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে ৪২ জন এবং ২০২৪ সালে ৫৮ জন মৃত্যুবরণ করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই এই সংখ্যা ১৯-এ পৌঁছেছে, যা পরিস্থিতির ক্রম-অবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/168714