বগুড়ায় ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষক
স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়ায় পুরোদমে শুরু হয়েছে ইরি-বোরো মৌসুমের ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ। মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হলেও এখন পর্যন্ত বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় ফসল ঘরে তুলতে কার্পণ্য করছেন না কৃষক। তবে শ্রমিক সংকটে অনেকটাই দিশেহারা তারা। আবার বাড়তি মজুরি দিয়ে শ্রমিক মিললেও প্রতি মণ ধানের দামের চেয়ে তাদের বেশি পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে। আজ সোমবার (১১ মে) বগুড়া সদরের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
কৃষকরা বলছেন, এবার এ অঞ্চলে এখন পর্যন্ত প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ দেখা দেয়নি। বিগত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি। নানা প্রতিকূলতার পরেও বিঘা প্রতি ফলন ভালো হলেও ধানের বর্তমান দাম নিয়ে খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা। প্রকৃতিক দুর্যোগের ভয়ে আগেভাগে ধান কাটতে চাইলেও সময়মতো মিলছে না শ্রমিক। আবার বাড়তি দাম দিয়ে শ্রমিক মিললেও এক মণ ধান বিক্রি করেও তাদের মজুরি মেটানো যাচ্ছে না।
বগুড়া সদর উপজেলার শেখপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল হাই, রবিবাড়িয়ার মনির হোসনে, শ্যামবাড়িয়ার সাজু মিয়া ও আব্দুল গফুর বলছেন, এবার বিঘাপ্রতি জাতভেদে ১৬ থেকে ২২ মণ পর্যন্ত ধান পাওয়া যাচ্ছে। পক্ষান্তরে এক বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। জাতভেদে মোটা-চিকন, ভেজা-শুকনো সর্বনিম্ন ৮শ’ থেকে সাড়ে ১১শ’ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
এই কৃষকরা জানান, এবার এখন পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো থাকায় তারা অনেকটা নির্বিঘ্নে ধান ঘরে তুলতে পারছেন। শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে বাড়িত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ধান কাটতে একজন শ্রমিক ৯শ’ টাকা পর্যন্ত মজুরি নিচ্ছেন। ৭শ’ টাকায় শ্রমিক মিললেও অন্যান্য খরচ মিলে তা ৮শ’ টাকার বেশি পড়ছে। সবমিলে এবার ধান চাষ করে খরচ তোলা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারা অভিযোগ করে বলেন, ধানের সরকারি ক্রয় মূল্যের প্রায় অর্ধেক দামে বাজারে বা ফড়িয়াদের কাছে বাধ্য হয়ে তাদের ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারিভাবে ধান কেনার প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করার দাবি জানান তারা। বগুড়া সদরের ধান ব্যবসায়ী সালেক মিয়া জানান, এখন পর্যন্ত হাট-বাজারে ধানের যে দাম তাতে কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠছে না।
তারা প্রতি মণ মিনিকেট ধান ১১শ’ টাকা, বিআর আটাশ ৮৫০, ঊনত্রিশ ৮শ’ এবং কাটারিভোগ এক হাজার ১৫০ টাকায় কিনছেন। এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, বগুড়ার স্থানীয় হাট-বাজারে মান ও জাতভেদে প্রতি মণ ধান সর্বনিম্ন ৮শ’ এবং সর্বোচ্চ ১২শ’ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। তবে দাম আরও বাড়বে জানিয়ে এই ব্যবসায়ী বলছেন, তখন কৃষকের কাছে বিক্রি করা মতো ধান থাকবে না, ওই বাড়তি দামের ধান থাকবে ফড়িয়া ও মিলারদের কাছে।
এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়া সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৯২৬ মেট্রিকটন চাল। আজ সোমবার (১১ মে) পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ২১ শতাংশ। হেক্টর প্রতি ফলন পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ১ মেট্রিকটন। আর সরকারিভাবে বগুড়ায় এক কেজি ধানের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ২৯ টাকা ৭১ পয়সা।
এই কার্যালয়ের উপ-সহাকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বলেন, বগুড়ায় সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনের যে খরচ পড়েছে বর্তমান বাজার মূল্যে কৃষকের সেই খরচ উঠছে না। আবার সময়মতো কৃষি শ্রমিক না পাওয়ায় বাড়তি মজুরির কারণেও কৃষককে মাঠে থাকা ধান নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে। তবে ধানের দাম বাড়বে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, বগুড়ায় যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয় তার তুলনায় তাদের কেনার লক্ষ্যমাত্রা অনেক কম দেওয়া হয়। চলতি মৌসুমে মাত্র ১৭ হাজার ৭৮০ মেট্রিকটন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তারা শুধু অনলাইনে বা এ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধিত কৃষকের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট মানের ধান কিনে থাকেন। ফলে বর্তমান ধানের বাজার মূল্য নিয়ে তাদের কিছু করার নেই।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/168561