রাজনীতি হোক তরুণদের স্বপ্ন পূরণের সহায়ক শক্তি

রাজনীতি হোক তরুণদের স্বপ্ন পূরণের সহায়ক শক্তি

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের এই যুগে আমাদের দেশের তরুণ সমাজ ইন্টারনেট,সোশ্যাল মিডিয়া ও বিশ্বায়নের অগ্রগতির সাথে যেমন বেড়ে উঠছে,তেমনি নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে শুধু দেশে নয়,উন্নত দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগের দিকেও দৃষ্টি রাখছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যাশার সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি,শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্ম কাঠামো অনেকটাই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। যেখানে তারা চায় জবাবদিহিতা,স্বচ্ছতা ও মেধার স্বীকৃতি,সেখানে তারা প্রত্যক্ষ করে কর্মসংস্থানের ব্যাপক অভাব,আর  সুবিধাবাদী চক্রের দুর্দমনীয় দাপট। পরিসংখ্যান বলছে-বাংলাদেশে কর্মক্ষম যুবক-যুবার সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ,যা মোট জনশক্তির প্রায় ২৮ শতাংশ। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে শিক্ষিত বেকারের হার প্রায় ১৩.০৫ শতাংশ,যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর চেয়ে  বেশি। যুগ যুগ ধরে বিরাজমান এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির শিকার দেশের তরুণ সমাজের চোখে যে সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ দেখার স্বপ্ন,তা মøান হয়ে যাচ্ছে, যখন তারা  প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া,সংবাদমাধ্যমে দেখছে-সরকারি চাকরির নিয়োগ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি,স্বাস্থ্যসেবা, উন্নয়ন প্রকল্প ইত্যাদি সবখানে দুর্নীতির কালো থাবা। জটিল আমলাতন্ত্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে চাকরির যে সীমিত সুযোগ,সেটিরও সম্ভাবনা না দেখে তরুণদের একটি অংশ যখন উদ্যোক্তা হতে ব্যবসা শুরু করতে যায়,তখন তাদের মুখোমুখি হতে হয় লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আর অনৈতিক লেনদেনের গ্যাঁড়াকলের। এটি তাদের  মনোবল নষ্ট করে দেয় এবং দিচ্ছেও।  ফলে  তারা না পায় প্রত্যশিত চাকরি,না পারে সফল উদ্যোক্তা হতে। এই হতাশা থেকে যখন তারা প্রশাসন ও রাজনীতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে,তখন শুধু তাদেরই ক্ষতি হয় না,দেশও হারায় যোগ্য ও কর্মক্ষম তরুণদের অর্জিত অভিজ্ঞতা,শ্রম ও মেধা। এই সুযোগে রাজনীতিও তখন স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাভোগীদের কব্জায় চলে যায়। অথচ রাজনীতি হওয়া উচিত তরুণদের স্বপ্নপূরণের পরিপূরক। তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে ধারণ করতে না পারলে সেই রাজনীতি যে দেশগঠনেও কোন কাজে আসে না,সেটি অনুধাবন করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এই সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখারও কোন সুযোগ নেই। নতুন সরকার মানুষকে যেসব স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের এই সংকট থেকে উত্তরণের ভাবনা ভাবতে হবে সক্রিয়ভাবেই। সেজন্য প্রয়োজন আজ তরুণদের কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি করা, প্রয়োজন তাদের কর্ম উপযোগী করে গড়ে তোলা। প্রয়োজন সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা,মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা। বেসরকারি খাতে শুধু পোশাকশিল্প নয়,বহুমুখী কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে,বিশেষত তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও পর্যটন খাতের মতো সম্ভাবনাময় শিল্পগুলোতে। শিক্ষাব্যবস্থাকে চাকরির বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। তরুণদের যে অংশটি তথ্য প্রযুক্তি জ্ঞানে এগিয়ে রয়েছে, তাদের বাইরে যে বিপুল সংখ্যক অদক্ষ তরুণ-তরুণী কাজের সন্ধানে ব্যাপৃত, তাদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ করে দিয়ে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ দিতে হবে। সর্বোপরি  জাতীয় উন্নয়ন ভাবনায় তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন-তরুণদের মতামত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন,কারণ তারাই তো দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। রাষ্ট্রচিন্তকদের বুঝতে হবে-তরুণরা তাদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ চায়, করুণা নয়। তারা তাদের শ্রম,মেধা ও দক্ষতা দিয়ে এই দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চায়। নিকট অতীতে বাংলাদেশের তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনগুলো,যেমন-২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন,কোটা সংস্কার আন্দোলন,২০২৪ এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও পরে সরকার পতনের আন্দোলন এই বার্তাই দিয়েছে যে-তরুণ প্রজন্ম  শুধু স্বপ্নই দেখবে না,তারা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামও করবে। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ অর্জুন আপ্পাদুরাইয়ের ‘ক্যাপাসিটি অব অ্যাসপায়ার’ তত্ত্ব অনুযায়ী এই আন্দেলানগুলো ছিল আসলে ‘পুননির্মাণের প্রচেষ্টা।’ যখন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দেয় না,তখন রাস্তা,ডিজিটাল সিস্টেম কিংবা আন্দোলন হয়ে ওঠে তাদের স্বপ্ন পূরণের এক একটি প্লাটফরম। তাই তাদের এই আন্দোলনগুলোকে কেবল কিছু নির্দিষ্ট দাবির জন্য নয় বরং এগুলোকে  তরুণদের ভবিষ্যৎ ও মর্যাদার সাথে বাঁচার  সম্মিলিত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই তরুণদের প্রত্যাশা পূরণের সুযোগ তৈরির ওপরই। তাই বর্তমানের হতাশাজনক পরিস্থিতি বদলাতে হলে শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়,প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন খাতে নতুন বিনিয়োগ আনতে হবে। রাজনীতির সঠিক ও লেজুড়বৃত্তিহীন স্বচ্ছ ধারা তৈরির জন্য মেধাবী ও দক্ষ তরুণ তরুণীদের রাজনীতিতে যথাযোগ্য স্থান করে দিতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিগত সহায়তা ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্নীতি দমন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘদিনের একটি কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারি সরকারের পতনের পর পরিবর্তনকামী তরুণ প্রজন্মের মনে দীর্ঘদিনের পুষে রাখা যে আকাক্সক্ষাগুলো সামনে এসেছে,সেসবকে আমলে নিয়ে কার্যকর উপায় পদ্ধতি উদ্ভাবনের দায়িত্ব এখন ক্ষমতাসীন সরকারের। পাশাপাশি দেশের আর্থিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দুর্নীতিমুক্ত উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়ের যে রাজনীতি বর্তমান সরকারের-উদ্যমী ও কর্মক্ষম তরুণ সমাজও যেন সেটিকে ধারণ করতে পারে,সেই সুযোগ তাদের দেয়া হোক এবং সেই  গঠনমূলক ও স্বচ্ছ রাজনীতিই হোক তাদের স্বপ্ন পূরণের ও জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনে অবদান রাখার সহায়ক শক্তি।  

লেখক :

রাহমান ওয়াহিদ

কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/168472