উত্তরবঙ্গে কৃষি শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে আসতে পারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধতা

উত্তরবঙ্গে কৃষি শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে আসতে পারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধতা

দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব হতেই উত্তরবঙ্গ সব দিক থেকেই অবহেলিত। এখানকার মানুষের জীবনযাপন ও জীবনমানের সুযোগ-সুবিধা খুবই নিম্নমানের ছিল। শিক্ষার হার, আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের হার, শ্রমঘন কার্যক্রম প্রভৃতি ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গ বেশ পিছিয়ে ছিল। কিন্তু এই উত্তরবঙ্গ কৃষিক্ষেত্রে বেশ উর্বর। এখানকার জমিতে বছরে ০৩টি ফসল হয় এবং ফসল সারা বাংলাদেশেই সরবরাহ করা হয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাড়ি উত্তরবঙ্গ তথা বগুড়া জেলায় হওয়ায় তিনি প্রথম অনুধাবন করেন এই উত্তরবঙ্গকে কৃষি প্রধান হিসেবে কিভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। তাইতো তিনি উত্তরবঙ্গের অনেক জেলায় খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। এতে উত্তরবঙ্গের যেসব এলাকাকে পানির অভাবে শুকনো মৌসুমে ফসল চাষ করা সম্ভব হতো না সেসব এলাকা ফসল চাষের আওতায় নিয়ে আসা হয়। বিভিন্ন মৌসুমে উত্তরবঙ্গে প্রচুর সবজি চাষ হয়। উত্তরবঙ্গ হতে প্রতিদিনই ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায় সবজি স্থানান্তর হয়। তবুও মৌসুমীকালীন বিশেষ করে আলু, টমেটো, শসা, গাজর, কাঁচামরিচ, বেগুনের ন্যায্য মূল্য কৃষকেরা পায় না। এছাড়া সংরক্ষণের অভাবেও অনেক শস্য পচে নষ্ট হয়ে যায়। মরহুম রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক স্থাপন করে উত্তরবঙ্গের সাথে কিছুটা যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তীতে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর যমুনা সেতু নির্মাণ করে উত্তরবঙ্গের সাথে সড়ক পথে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করা হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় এসে রেল যোগাযোগ ও বিমানবন্দর স্থাপনের জন্য জোর তাগিদ দিয়েছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে উত্তরবঙ্গ অর্থনৈতিক ভাবে দেশের চিত্র পাল্টে দিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে মর্মে বিশ্বাস করি। উত্তরবঙ্গে কার্গো বিমান চালু হলে জরুরিভাবে একটি ইপিজেড প্রয়োজন হবে। এই ইপিজেড এর মাধ্যমে উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কৃষক সমাজ কৃষিতে ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। এছাড়া কৃষি ভিত্তিক বিশেষ করে উন্নত মানের আলুর চিপস, টমেটো সস, ভুট্টোর বিস্কুট, রুটি, গাজরের তৈরি হালুয়া প্রভৃতি শিল্প কারখানা চালু হলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে। আমরা মৌসুমীকালিন আম, কাঁঠাল, আনারস, তরমুজ, লিচু প্রভৃতি ফল সমূহ উন্নতমানের কোল্ড ষ্টোরেজের মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। এতে জনগণ সারা বছরই এসব ফল যেমন খেতে পারবে, ভিটামিন পুষ্টি পাবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, তেমনি কৃষকগণের ন্যায্যমূল্যের প্রাপ্তি ঘটবে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর মধ্যে বর্তমানে বগুড়ায় ১২০টি বড় শিল্প কারখানা, ১৯টি মাঝারী শিল্প কারখানা, ২৩৫১টি ক্ষুদ্র শিল্প এবং ৭৪৫টি কৃষিভিত্তিক শিল্প রয়েছে। বগুড়া জেলার অর্থনীতি শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য ও কৃষির উপর বেশ নির্ভরশীল। দেশের শিল্প বাণিজ্যের প্রসারে বগুড়া জেলার একটি ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত অনুন্নয়ন, মুক্ত বাণিজ্য, শুল্ক মুক্ত না হওয়া, ভিনদেশী পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, ভূমির মালিকানা হস্তান্তর ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি প্রভৃতি শিল্প বাণিজ্যে প্রসারে বাধা বলে মনে করা হয়। স্বাধীনতার আগে দেশে ও বিদেশে বগুড়ার ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের বেশ সুনাম থাকলেও সেগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের খাদ্য চাহিদার ৫০% ও কৃষি ভিত্তিক শিল্পের ৭০% কাঁচামাল উত্তরাঞ্চল থেকে সরবরাহ করা হলেও দুঃখের বিষয় এ অঞ্চলে এখনো বড় আকারে কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে ওঠেনি। দেশের মোট শিল্প কলকারখানার মাত্র ১২% উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। খাদ্য শস্যের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চলের গত ০৫ বছর ধরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রতিবছর গড়ে শতকরা ৫ ভাগের বেশী হারে চাল উৎপাদন করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা দেশের উন্নয়নে বেশ সহায়ক। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সুষ্ঠু যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর অভাবে উত্তরাঞ্চল সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা দীর্ঘ সময় ধরে বঞ্চিত ছিল। তাই সময় এসেছে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের দিকে ধাবিত হওয়ার। বর্তমানে দীর্ঘ সময় থেকে বঞ্চিত উত্তর জনপদের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার। আর এক্ষেত্রে কৃষিপণ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার যোগ্য শিল্প কারখানা স্থাপনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা। যাহাতে কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য প্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল জনসংখ্যার কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি ইকোনমিক জোনগুলোকেও গুরুত্ব প্রদান করা আবশ্যক। সরকারি সুযোগ সুবিধা পেলে বেসরকারি ইকোনমিক জোনগুলো তাদের কার্যক্রমে গতি সঞ্চার করতে পারবে। নতুন সরকার, নতুন স্বপ্ন, উত্তরবঙ্গের জনগণ যে স্বপ্ন দেখছে, জনগণের প্রত্যাশা সরকার অবশ্যই এবার উত্তরবঙ্গের জন্য নিবেদিত হয়ে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার হওয়া উত্তরবঙ্গবাসীদের মুখে হাসি ফুটাবে। আর এই অপেক্ষায় উত্তরবঙ্গবাসী।

লেখক :  

নজিবর রহমান জিয়া

কলামিষ্ট 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/167982