হকার উচ্ছেদ নয়, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাই হতে পারে অর্থনীতির সম্ভাবনা

হকার উচ্ছেদ নয়, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাই হতে পারে অর্থনীতির সম্ভাবনা

নগর জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা “হকার”। এটি শুধু একটি পেশা নয়, বরং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সারা দেশে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ২০ লাখের কম নয়, আর তাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অন্তত ১ কোটি। শুধু ঢাকা শহরেই হকারের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ; এর মধ্যে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার হকার সমিতির সদস্য, আর বাকি ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ ভ্রাম্যমাণভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই বাস্তবতায় হকারদের হঠাৎ উচ্ছেদ মানে শুধু ফুটপাত খালি করা নয় বরং লাখো পরিবারকে মুহূর্তের মধ্যে কর্মহীন করে দেওয়া। এর ফলে যেমন গভীর আর্থিক সংকট তৈরি হবে, তেমনি দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ বাস্তবতা হলো এই হকাররাই দেশের উৎপাদিত এসব পণ্যের অন্যতম প্রধান বিক্রয় মাধ্যম। এমন পরিস্থিতি সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই প্রশ্ন একটাই, সমাধান কি উচ্ছেদ, নাকি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা? অভিজ্ঞতা বলছে, উচ্ছেদ কখনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে টেকসই পথ। বিশ্বের বিভিন্ন শহর ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনের মতো নগরগুলো হকারদের দমন না করে বরং নিবন্ধন, নির্দিষ্ট স্থান ও সময়সূচির মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় এনেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে, ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনযাত্রার আড়ালে একটি অদৃশ্য অর্থনীতিও সমানতালে প্রবাহিত হচ্ছে। ফুটপাত, বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রবাহ, যেখানে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়। শোনা যায়, শুধু একটি বড় বাজারেই প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার মতো অর্থ ঘুরে বেড়ায়। বছর শেষে এই অঙ্ক দাঁড়ায় হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ছায়া অর্থনীতিতে, যার নেই কোনো স্বচ্ছতা, নেই জবাবদিহিতা। এই অনিয়ন্ত্রিত অর্থপ্রবাহের ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, সহিংসতা এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ী ও পথচারীরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হন। অথচ এই বিপুল অর্থ যদি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৈধ কাঠামোর আওতায় আনা যায়, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যুক্ত হয়ে নগর উন্নয়ন, অবকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা ও জনসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা “বাংলাদেশ ২.০” এর যে স্বপ্ন দেখি, তা বাস্তবায়নের জন্য এই খাতের সংস্কার অপরিহার্য। একটি আধুনিক, সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হলে নগর ব্যবস্থাপনার এই অনিয়ন্ত্রিত অংশকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতেই হবে। অতীতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাক্সিক্ষত ফল আসেনি। তাই এখন প্রয়োজন নতুন, কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ।এক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। হকারদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা। সরকার চাইলে এ খাতের জন্য একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় বা বিশেষায়িত অধিদপ্তর গঠন করতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের সকল হকারকে একটি জাতীয় ডাটাবেইজে অন্তর্ভুক্ত করা, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন চালু করা এবং ইউনিক আইডি কার্ড প্রদান করা সম্ভব হবে।

নির্দিষ্ট স্থান ও সময়সূচি নির্ধারণ করে দিলে শহরের শৃঙ্খলা যেমন ফিরবে, তেমনি হকাররাও নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা করতে পারবেন। তাদের দোকান বা ভ্যানগুলোকে নির্দিষ্ট নকশা ও ভিন্ন ভিন্ন রঙে সাজানো যেতে পারে যেমন খাবার, পোশাক, ফলমূল বা অন্যান্য পণ্যের জন্য আলাদা কালার কোড, যা শহরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা দুটোই বাড়াবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং চালু করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করলে যানজটও কমবে এবং পথচারীদের চলাচল সহজ হবে। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারকে এ নিশ্চয়তা দিতে হবে যে পুলিশসহ কোনো প্রভাবশালী মহল বা হকার সমিতি তাদের হয়রানি করতে পারবে না। বর্তমানে অনেক হকার প্রতিনিয়ত অনানুষ্ঠানিকভাবে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে বাধ্য হন। এই চক্র ভেঙে একটি স্বচ্ছ ফি কাঠামো চালু করা গেলে দুর্নীতি কমবে, হকাররা স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারবেন এবং রাষ্ট্রও বৈধ রাজস্ব পাবে। এছাড়াও ক্ষুদ্র ঋণ, প্রশিক্ষণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে এই খাত আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী দামে প্রয়োজনীয় পণ্য পাবে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে হকারদের পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের যে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এবার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই উদ্যোগগুলো কার্যকর করা জরুরি।

নিশ্চয়ই কাজটি সহজ নয়। দীর্ঘদিনের একটি জটিল কাঠামো পরিবর্তনে সময়, সমন্বয় ও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। তবে অসম্ভব নয়। সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত শুধু হকারদের জীবনমান উন্নত করবে না, বরং দেশের অর্থনীতি ও নগর ব্যবস্থাপনাকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এই খাতকে সঠিকভাবে সংগঠিত করা গেলে শহরের সব কার্যক্রম চেইনের মতো সমন্বিত হয়ে নগরজীবনে শৃঙ্খলা, গতি ও ভারসাম্য এনে দেবে। ঢাকা শুধু ইট-পাথরের শহর নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও দায়িত্বের প্রতিচ্ছবি। সময়ের দাবি একটাই উচ্ছেদ নয়, পরিকল্পিত, মানবিক ও টেকসই ব্যবস্থাপনার পথে এগিয়ে যাওয়া। হকারকে সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনা হিসেবে দেখে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলেই আমরা একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে পারব। 

লেখক:

কৃষিবিদ মুহাম্মদ তাহাজ্জত আলী 

ব্যাংকার ও গবেষক 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/167642