কোচিং সংস্কৃতি: শিক্ষার বিকল্প নাকি বোঝা

কোচিং সংস্কৃতি: শিক্ষার বিকল্প নাকি বোঝা

বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় “কোচিং সংস্কৃতি” একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়। স্কুল-কলেজের শিক্ষা এখন কোচিংনির্ভর। শ্রেণিকক্ষে এখন আর পাঠদান হয় না, শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে এসে কোনোরকমে গল্পগুজব করে সময় কাটিয়ে দেয় এবং শিক্ষার্থীরাও শ্রেণীকক্ষে এসে একটু মজা করে, একটু খেলাধুলা করে চলে যায় যার ফলে তাদের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ হয় না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কোচিং এর উপর নির্ভরশীলতা তাদের শ্রেণীকক্ষের প্রতি অনিহা সৃষ্টি করে। এছাড়াও শিক্ষকরা তাদের বেতনের পাশাপাশি অতিরিক্ত আয় হিসেবে কোচিং করায়। অন্যদিকে  যেহেতু শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজের পড়া শ্রেণীকক্ষে পায় না সেহেতু তাদের কোচিং ছাড়া ভালো রেজাল্ট করার সুযোগ থাকে না। বর্তমানে তারা কোচিংকে শিক্ষার মূল উৎস হিসেবে ধরে নিয়েছে। আর এ কোচিং করাতে গিয়ে অভিভাবকদের বাড়তি টাকা গুনতে হয়। কিন্তু  যেসব শিক্ষার্থী আর্থিকভাবে অসচ্ছল তারা এ টাকার কেনা শিক্ষা  কিনতে পারে না এবং ক্লাসেও তাদের পড়ালেখা হয় না শিক্ষকদের কোচিংমুখী মনোভাবের জন্য কারণ যারা কোচিং করে শিক্ষকদের কাছে, তাদের প্রতি শিক্ষকরা বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে দূরে চলে যায়, তাদের কাছে কোচিং সহায়ক নয়, বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। 

দেশে নিবন্ধিত কোচিং সেন্টার সংখ্যা ৬ হাজার ৫৮৭। এর মধ্যে একাডেমিক ৬ হাজার ৩১২টি ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি বা চাকরিসংক্রান্ত কোচিং সেন্টার রয়েছে আরো ২৭৫টি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘বেসরকারি  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৪’-এ উল্লেখ করা হয়েছে এ তথ্য। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা যদিও বলছেন, নিবন্ধনহীন কোচিং  সেন্টারের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ।  এসব নিবন্ধনহীন কোচিং সেন্টার  আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থাকে আরো পঙ্গু করে ফেলছে। 

যেহেতু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কোচিং  একটি বড় অংশ, এখন প্রশ্ন উঠছে - এই কোচিং  কী প্রকৃত শিক্ষার  বিকল্প, নাকি এটি শিক্ষার্থীদের ওপর এক অতিরিক্ত চাপ বা বোঝা? প্রথমত, এটি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বড় ক্লাসে শিক্ষকরা সব শিক্ষার্থীর প্রতি সমান মনোযোগ দিতে পারে না ; ফলে দুর্বল শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে। কোচিং সেন্টারে তুলনামূলক ছোট ব্যাচে পড়ানো হয়, ফলে ব্যক্তিগত যত্ন পাওয়া যায়। তাছাড়া পরীক্ষা  প্রস্তুতি, প্রশ্নের ধরন বোঝা, শটকার্ট কৌশল শেখা - এসব ক্ষেত্রে কোচিং  কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- কোচিং নির্ভরতা আমাদের শিক্ষার মুল কাঠামো দুর্বল করে দেয়। শিক্ষার্থীরা স্কুল বা কলেজের ক্লাসকে গুরুত্ব না দিয়ে কোচিংকেই শিক্ষার মুল মাধ্যম হিসাবে দেখছে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ  হয়। পাশাপাশি কোচিং  একটি ব্যয়বহুল ব্যবস্থা; দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে, যা শিক্ষার  বৈষম্য বাড়ায়। আবার কোচিং সেন্টারের অতিরিক্ত চাপ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার হ্রাস ঘটায়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য যেখানে জ্ঞান অর্জন ও চিন্তাশক্তির বিকাশ, সেখানে কোচিং ‘পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার মেশিন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার, শিক্ষকরা কোচিংকে তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রূপ দিয়েছি। কিন্তু এক্ষেত্রে শিক্ষকরাই ক্লাসে সম্পূর্ণভাবে না পড়িয়ে কোচিংয়ে পড়ানোর প্রবণতা দেখান,  যা নৈতিকতা বর্জিত কাজ এবং পেশাগত দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। এতে শিক্ষা একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হাওয়ায় ঝুঁকি তৈরি হয়। 

পরিশেষে বলা যায় কোচিং সংস্কৃতি একদিকে যেমন দুর্বল শিক্ষার্থীদের সহায়ক বা বিকল্প; অন্যদিকে এর ব্যয়বহুল দিক অনেক অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বোঝা। তাই সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধমে কোচিং নির্ভরতা কমিয়ে বাস্তব এবং শ্রেণিকক্ষ ভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কোচিংকে শিক্ষার মূল মাধ্যম না ধরে সহায়ক হিসেবে ধরতে হবে। শিক্ষকদেরকে শ্রেণিকক্ষে ভালোভাবে পাঠদান করতে হবে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা যত্ন সহকারে বোঝাতে হবে তবেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে। 

লেখক :

কাকলি আক্তার

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/167504