নারীর সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজন পারিবারিক অধ্যাদেশের সংশোধন
আজ বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি হয়েছে। মানুষের পরিবর্তে AI দিয়ে কঠিন কঠিন কাজ করানো হচ্ছে। দূর স্যাটেলাইটের সাহায্যে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করে বের করা হচ্ছে কোন দেশ কোন মারণাস্ত্র তৈরী করছে। হাজার মাইল দূর থেকে রকেট বা মিসাইল নিক্ষেপ করে শত্রু দেশকে ধ্বংস করা হচ্ছে। ডগ স্কোয়াড্ দিয়ে অপরাধিকে সনাক্ত করা যায়। কিন্তু, আমাদের দেশের কোন ডিলার কত টাকায় এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিμয় করছে তা সনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা যাচ্ছেনা। অর্থনীতির আদর্শ যেখানে দামস্তর ও মূদ্রাস্ফীতির বৃদ্ধি। সেখানে সকল কিছুর দাম বৃদ্ধিই পাবে, শুধু ব্যতিক্রম মানুষের মানবিকতা, মূল্যবোধ ও জীবনের। বাঙ্গালী বীরের জাতি- তার প্রমাণ তাদের জীবীকা অন্বেষনে বঙ্গপোসাগর সহ আটলান্টিক মহাসাগর সাধারণ নৌকা কিংবা সাঁতরে পাড়ি দেওয়াতেই বুঝা যায়। দেশের মঙ্গলের জন্য নিজ দেশীয় অন্যকে প্রতারিত ও বঞ্চিত করতে পিছ-পা না হওয়া এ জাতি এখন আর অসহায়, দুর্বলের ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় পায়না। অসহায়ের আর্তনাদে কারো ব্যথিত হওয়ার ফুরসৎ নেই। এমনি এক যুগ সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে বিশ্ব।
আমাদের দেশে মুসলিম জনগোষ্ঠি ব্যক্তিগত তথা উত্তরাধিকারের বিষয় মুসলীম আইন বা শরীয়াহ আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। শরীয়াহ আইন অনুযায়ী কোন ব্যক্তির মৃত্যূর পূর্বে তার কোন পূত্র বা কন্যা মৃত্যূবরণ করলে মৃত পূত্র বা কন্যার পূত্র বা কন্যা প্রথমক্ত ব্যক্তির মৃত্যূর পর তার সম্পত্তিতে কোন উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করতনা। ফলে অনেক সাধারণ পরিবারের মতো অনেক প্রতিষ্ঠিত পরিবারের পূত্র বা কন্যাদেরকেও উত্তরাধিকারিত্ব লাভ থেকে বঞ্চিত হয়ে অর্থাভাবে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হত। সৃষ্টি হত নানা সামাজিক জটিলতা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তৎকালীন সরকার ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ জারী করে। উক্ত আইনের ৪ ধারায় বলা হয় “In the event of the death of any son or daughter of the propositus before the opening of succession, the children of such son or daughter, if any, living at the time the succession opens, shall per stirpes receive a share equivalent to the share which such son or daughter, as the case may be, would have received if alive” অর্থাৎ- পিতার মৃত্যূর পূর্বে পূত্র কিংবা কন্যা মৃত্যুবরণ করলেও পিতার মৃত্যূর পর মৃত পূত্র বা কন্যার জীবিত পূত্র বা কন্যা জীবিত থাকলে মৃত্যূ ব্যক্তির পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করবে। এই আইনে বিধবা স্ত্রীর উত্তরাধিকারিত্ব বা স্বত্বলাভের কথা বলা নেই।
জনবিদ্যা অনুসারে যে সমস্ত নারী ১৮-৪৯ বছর বয়সের মধ্যে বিধবা হন তারা আবার দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিবাহ করে জীবনযাপন করতে পারবেন। কিন্ত, যে সমস্ত নারী ৫০ বছরের পর বিধবা হন তারা না পারে দ্বিতীয় বিবাহ করতে, না পায় মৃত্যু স্বামীর পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারিত্ব। আজ পৃথিবী এগিয়ে গিয়েছে, সমাজে আর একান্নবর্তী পরিবার নেই। একটি কাক বিপদে পরে আর্তনাদ করলে, অন্য কাকেরা দল বেঁেধ বিপদগ্রস্ত’ কাককে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসলেও। এখন আর কেউ বিপদে পরা অসহায় দুর্বল মানুষের ডাকে সাড়া দেয়না। অসহায়ের আর্তনাদে ব্যথিত হওয়ার ফুরসৎ নেই। মানুষ জীবিকার অন্বেষণে দিগদ্বিক ছুটে চলছে দেশ থেকে দেশান্তরে, কাল থেকে কালান্তরে। যুগের পরিμমায় মানুষকে বৃদ্ধ বয়সে আশ্রয় নিতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। এই অবস্থায় পিতার মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুবরণকারী পূত্রের বিধবা স্ত্রীর অবর্ণনীয় দুরাবস্থা দূর করার জন্য মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ কি স্বপ্রণোদিত হয়ে সিভিল রিভিশন ২৪৭৭/২০০৪ এর অনুরূপ আদেশ দিয়ে মুসলিম বিধবা নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না? এমনকি আইন বিভাগ ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারার সংশোধন করলে বিরাট অন্যায় হবে কি? বরং সামাজিক উন্নয়নের মাপকঠিতে নারীর অবস্থানের উন্নতিই ঘটবে।
লেখক :
এড. মোঃ আব্দুল মালেক
আইনজীবি-প্রাবন্ধিক
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।