দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন লক্ষণীয়

দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন লক্ষণীয়

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা একটি উন্নয়নশীল স্বাধীন দেশ, সুশাসন ও গর্বিত জাতি হিসেবে স্বপ্ন দেখা শুরু করি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হতে দেশে বিভিন্ন ধরনের স্বৈরশাসক দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। স্বৈরশাসকগুলোর ধারাবাহিক একচ্ছত্রভাবে দেশ পরিচালনার দরুন বাঙালি জাতির সেই স্বপ্ন গুড়েবালিতে পরিণত হয়। এমনকি ১৯৭৪ সালের মত দুর্ভিক্ষ ও জনগণকে দেখতে হয়েছে। স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ০৯ বছরের স্বৈরশাসনও জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর হানাহানি, আন্দোলন, হরতাল, পুলিশের লাঠিচার্জ, গুলিবর্ষণ, গ্রেফতার, হয়রানি, মিছিল মিটিং প্রভৃতি ০৯ বছরের শাসনামলের নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল। অবশেষে ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশ প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়। জনগণ পুনরায় আশায় বুক বাধে এবং স্বপ্ন দেখা শুরু করে। দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হবে, কর্মসংস্থান হবে, মানুষ ০৩ বেলা পেট ভরে খেতে পারবে, আর্থ সামাজিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। সর্বোপরি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। দেশের আর্থ-সামাজিক, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি সম্প্রসারণ, শিক্ষা ব্যবস্থা প্রভৃতির উন্নয়ন হলেও সুশাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। সরকারি ও বিরোধীদলের রাজনৈতিক হানাহানি, একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি প্রভৃতি বিষয়ে দেশ পুনরায় উত্তাল হতে শুরু করে, দেশের ভেতরে পুনরায় রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সেই ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর হতে ২০২৪ সালের ০৫ই আগষ্টের পূর্ব পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নামে আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ২১ বছর ফ্যাসিষ্ট সরকার হিসেবে ক্ষমতায় থেকে বিরোধী দল নিশ্চিহ্ন করার নামে এমন কোন অন্যায়, অত্যাচার নাই যা প্রয়োগ করা হয়নি। সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে যে একটা মধুর সম্পর্ক তা কখনওই জনগণ দেখতে পায়নি। সরকার ও বিরোধীদলের এই ত্যক্ত সম্পর্কের কারণে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে দেশ। দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা এই অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা প্রেক্ষিত জনগণের সহ্য ক্ষমতা এক পর্যায়ে ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটতে বাধ্য হয়। তাইতো ২০২৪ সালের ৫ই আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এই ০৫ই আগষ্ট দেশের জনগণের কাছে এত মর্যাদা ও বাঙালি জাতির কাছে বিশেষ দিন হিসেবে প্রতিপালিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বর্তমানে দেশ পরিচালনা করছে।  তারেক রহমান দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর দেশের বাইরে তথা যুক্তরাজ্যে ছিলেন। ফলে তার জ্ঞান, মেধা, পরিবর্তনশীলতা, মানসিকতা বা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্ব, শ্রম ও সময় জ্ঞান সম্পর্কে এদেশের জনগণের কিছুই জানা ছিলনা। তবে জনগণের বিশ্বাস ছিল দীর্ঘ ১৭ বছর পর যে নেতা দেশের মাটিতে পা দিচ্ছেন, সে নেতা অবশ্যই দেশের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করবেন। আমরা অবশ্যই স্বচক্ষে দেশের রাজনৈতিক অবস্থার গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান সচিবালয়ের সবাইকে সময় জ্ঞান পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজে যখন সকাল ৯.০০ টায় অফিসে গমন করছেন এবং রাত ৯.০০-১০.০০টা পর্যন্ত কাজ করছেন। তখন অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং সচিবালয়ের কর্মচারীরা স্বয়ংμিয়ভাবে পরিবর্তন হতে বাধ্য হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনীর তোড়জোড় নেই। অর্থাৎ নিরাপত্তার বলয় হ্রাস করেছেন। ট্রাফিক সিগন্যাল প্রধানমন্ত্রী নিজের জন্যও প্রযোজ্য করেছেন। অফিসের পর্দা সরিয়ে অফিস কক্ষে প্রাকৃতিক আলোর ব্যবস্থা করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করছেন। বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা কর্মীদের সম্মান দেখিয়ে আস্থায় নেয়া, স্বল্প সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, খাল খনন কর্মসূচীর উদ্বোধন, কৃষক কার্ড বিতরণ প্রভৃতি কর্মসূচী ভোটের কালি শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই বাস্তবায়ন করা অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি গাড়ী বা বাড়ি গ্রহণ না করে নিজের গাড়ী ও ভাড়া বাড়ি ব্যবহার করেও যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা যায় তা দেশের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক ঘটনা। বিগত বছরের ন্যায় সংসদে অশালীন উক্তি, ব্যক্তিগত আμমণ, গালিগালাজ, চেয়ার, টেবিল ভাঙ্গা এগুলো থেকেও উত্তরণ ঘটেছে। তাছাড়া বিরোধী দলকে হয়রানি করা, গ্রেফতার করা, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা এগুলো থেকে দেশ মুক্তি পেয়েছে। আমরা সরকারি দল হিসেবে যেমন বিএনপি সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করছি, তেমনি এ ধারা বজায় রাখার জন্য বিরোধী দলকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিগত সরকারের লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। জনগণের চাহিদা মোতাবেক উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মত উপযুক্ত সময় প্রয়োজন। চাইলেই সরকার দ্রুত গতিতে দেশকে পরিবর্তন করতে পারবেনা। এজন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধতা। অর্থনৈতিকভাবে দেশকে সমৃদ্ধশালী করতে হলে সরকারকে অবশ্যই সময় দিতে হবে। এ পর্যন্ত জনগণকে অবশ্যই উপযুক্ত সময় দেয়া প্রয়োজন। 

লেখক

নজিবর রহমান জিয়া

প্রাবন্ধিক ও গবেষক 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/167183