অপচয় রোধে সঠিক সময়ে ধান কাটুন
সাধারণত মাঠ পর্যায়ে কৃষকগণ বোরো চাষে ২৫-৩০ বার সেচ দিয়ে থাকেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে বোরো চাষে একবার ৫০-৭০ মিলিমিটার সেচ দেওয়ার পর জমিতে দাঁড়ানো পানি শেষ হবার ৩ দিন পর পুনরায় সেচ দিলে ২৫-৩০ ভাগ পানি কম লাগ্বে। ফলে ২৫-৩০ বার সেচের পরিবর্তে ১৬-২০ বার সেচের প্রয়োজন হয় এবং কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায়। কাইচ থোড় থেকে দানা পর্যন্ত জমিতে ৩-৬ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে এতে অবাঞ্ছিত কুশি উৎপাদন হবে না এবং ধানের চিটা কম হবে। বোরো ধানের পরিপক্ক বা পাকা অবস্থায় (দুধ থেকে সোনালি রং) জমিতে ৩-৫ সেন্টিমিটার পানি রাখা প্রয়োজন, যখন ধান সোনালি রং ধারণ করতে শুরু করবে, তখন সেচ বন্ধ করে দিতে হবে । ধান কাটার অন্তত ১৫ দিন আগে মাঠের পানি নিষ্কাশন করে জমি পুরোপুরি শুকিয়ে ফেলতে হবে এতে ধান পাকা সুষম হয় এবং কাটতে সুবিধা হয়। বোরো ধান কর্তন যন্ত্র (কম্বাইন হারভেস্টার বা রিপার) ব্যবহারের ফলে দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে ধান কাটা গেলেও, বাংলাদেশে এর ব্যবহারে বেশ কিছু অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এর মধ্যে জমিতে পানি জমে থাকা বা স্যাঁত-সেঁতে থাকা। বোরো ধান কাটার সঠিক সময় হলো যখন শীষের শতকরা ৮০ ভাগ ধান পেকে সোনালি রঙ ধারণ করে। সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি (এপ্রিল-মে) সময় বোরো ধান কাটার উপযুক্ত সময়। ধান অতিরিক্ত পেকে গেলে বা আঠালো ভাব চলে গেলে তা মাঠে ঝরে পড়ার ঝুঁকি থাকে, তাই সঠিক সময়ে, বিশেষ করে আগাম জাত হলে দ্রুত কাটা জরুরি। শীষের উপরের দিকের ধান পাকা কিন্তু নিচের দিকের কিছু ধান আধা-পাকা বা সবুজ থাকতে পারে, তবে ৮০% পেকে গেলেই কাটার উপযুক্ত। এপ্রিল-মে মাসে প্রায়শই আগাম বন্যা, কালবৈশাখী ঝড় বা ভারী বৃষ্টিপাত হয়। ৮০ শতাংশ পেকে গেলে ধান কেটে ফেললে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে দন্ডায়মান ফসল রক্ষা পায়। ধান পুরোপুরি পেকে গেলে বা মাঠেই শুকিয়ে গেলে কাটার সময় ঝরে পড়ে, যার ফলে ফলন কমে যায়। ৮০ শতাংশ পাকা অবস্থায় কাটলে এই ঝুঁকি কমে সঠিক সময়ে (৮০-৮৫% পেকে গেলে) ধান কাটলে সর্বোচ্চ ফলন ও ধানের ভালো মান নিশ্চিত হয়। খুব বেশি পাকালে ধানের গুণগত মান কমে যেতে পারে। ধান ৮০-৮৫ শতাংশ পেকে গেলে প্রতিটি ধান পুষ্ট হয়। এ সময়ে কাটলে চিটা হওয়ার আশঙ্কা থাকে না এবং বীজের অংকুরোদ্গম ক্ষমতা (এবৎসরহধঃরড়হ ৎধঃব) সর্বোচ্চ থাকে। খুব বেশি পেকে যাওয়া ধান মাড়াই করার সময় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যার ফলে চালের মান নষ্ট হয়। সঠিক সময়ে কাটলে ভাঙা চালের পরিমাণ কমে। বোরো ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর হওয়ায় ডিজেলচালিত পাম্প বা বিদ্যুৎ বিলের ওপর খরচ নির্ভর করে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ প্রতি বিঘাতে আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ এবং ধান মাড়াইয়ের যন্ত্রে ডিজেল ব্যবহৃত হয়, যার খরচও বেড়ে গেছে। ধান কাটার যান্ত্রিক হারভেস্টারের জ্বালানি খরচ বাড়ায় বিঘা প্রতি ধান কাটতে এখন প্রায় ৩০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে (যা আগে ২৫০০ টাকার নিচে ছিল)। সামগ্রিকভাবে ডিজেলের দাম বাড়ায় বোরো ধানে উৎপাদন খরচ প্রায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা কৃষকের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধান উৎপাদনে বোরো মওসুম সর্বাধিক উৎপাদনশীল। একথা অনস্বীকার্য বোরোর ওপর ভিত্তি করেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি রচিত হয়েছে। দেশের মোট উৎপাদনের ৬০ ভাগ আসে এ মওসুম থেকে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বোরো ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৫ থেকে ২.০ টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব যা জাতীয় উৎপাদনে বিশাল ভুমিকা রাখতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ধান উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য হলো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানো এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, মাঠপর্যায়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর, এবং খামারি অ্যাপের মাধ্যমে সঠিক ফসলের পরামর্শ দিয়ে কৃষিকে স্মার্ট ও লাভজনক করার লক্ষ্যে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে সরকার ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার, সুলভ মূল্যে কৃষি উপকরণ (বীজ, সার) সরবরাহ, জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের পুনর্বাসনসহ বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে । ১৪ এপ্রিল (১ বৈশাখ-১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন, যার মাধ্যমে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ২১ হাজারেরও বেশি প্রান্তিক কৃষক সরাসরি ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পান । এই ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্য মূল্যে কৃষি উপকরণ, সহজে ঋণ, সেচ সুবিধা ও ভর্তুকি পাবেন, যা ঝড়হধষর নধহশ অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, মাঠপর্যায়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর, এবং খামারি অ্যাপের মাধ্যমে সঠিক ফসলের পরামর্শ দিয়ে কৃষিকে স্মার্ট ও লাভজনক করার লক্ষ্যে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সকল মহলকে এগিয়ে আসতে হবে, বর্তমানে মাঠে দন্ডায়মান বোরো ধান ৮০% পাকলেই কর্তনের ব্যবস্থা নিতে হবে এই বার্তাটি কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে হবে।
লেখক:
ফরিদুর রহমান
প্রাবন্ধিক ও ডি. কৃষিবিদ
সাধারণ সম্পাদক, ডিকেআইবি, বগুড়া