জলবায়ু পরিবর্তন প্রকৃতির বিমাতৃসুলভ আচরণ
সমগ্র পৃথিবীতে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানবসৃষ্ট নানাবিধ কারণে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন প্রচন্ড ভাবে ভাবিয়ে তুলছে সচেতন মহল কে। জলবায়ু পরিবর্তন একদিন কিংবা দুইএক বছরে লক্ষ্য করার বিষয় নয়। গবেষণায় দেখা গেছে ত্রিশ চল্লিশ পঞ্চাশ বছর কিংবা তার থেকেও অধিক সময় ধরে প্রাকৃতিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষতি যা সহজে চোখে দেখা অথবা অনুমান করা যায় না কিন্তু পরবর্তীতে এই ক্ষতি যখন বৃহৎ আকার ধারণ করে তখন অতি সহজে দেখা যায়। তবে বাস্তবিক অর্থে তখন প্রতিকারের কোনো উপায় থাকে না। আমরা জলবায়ু পরিবর্তন বলতে সচরাচর বুঝে থাকি পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদী আবহাওয়ার গড় মেয়াদি পরিবর্তনকে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের পেছনে কখনো প্রকৃতি স্বয়ং নিজে আবার কখনোবা মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট অসংখ্য কারণ রয়েছে। প্রকৃতির কারণের মধ্যে যেমন সূর্যের তাপমাত্রার পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যৎপাত, সমুদ্রের স্রোতের অস্বাভাবিকতা এবং ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, পৃথিবীর গতির পরিবর্তন ও আবহাওয়ার পরিবর্তন ইত্যাদি কারণ সমূহ গবেষণায় উঠে এসেছে। পাশাপাশি মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট কারণ সমুহের মধ্যে অন্যতম কারণগুলো কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস অপরিকল্পিতভাবে স্বেচ্ছাচারিতার বশবর্তী হয়ে যত্রতত্র পোড়ানো, বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়া, বৈশ্বিক উষ্ণতা দিনদিন বৃদ্ধি পাওয়া যা মোটেও শুভকর নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী গাছপালা উজাড় করে বনাঞ্চল ধ্বংস করা এবং পাহাড় কেটে মানুষের ব্যবহারযোগ্য করে তোলা, বিভিন্ন ধরনের কলকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও যানবাহনের কালো ধোঁয়ার ফলে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ হ্রাসের ন্যূনতম ব্যবস্থা না নিয়ে বরং দিনদিন এর মাত্রা মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। প্রকৃতির সৃষ্ট ঘটনাবলীর উপর মানুষের প্রত্যক্ষভাবে সরাসরি কোনো হাত না থাকলেও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে নিজেদের সুবিধার্থে প্রকৃতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ এমন হাজারো উদাহরণ হিসেবে পেশ করা যেতে পারে যার প্রভাব জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে বলে একমত পোষণ করেছেন বিশেষজ্ঞগণ।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে শতবছরেরও বেশী আগে অর্থাৎ ১৮৯৬ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী আর্হেনিয়াস এই বিষয়ে সর্বপ্রথম সতর্কবার্তা প্রদান করেন। ওনার গবেষণালব্ধ তথ্যমতে প্রাকৃতিক ভাবে বায়ুমন্ডলে বিভিন্ন গ্যাস জাতীয় উপাদান যেমন- অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মানুষ সৃষ্ট বিভিন্ন যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানায় ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি বিশেষ করে কয়লা, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস এমনকি বসতবাড়িতে নিত্যদিনের রান্নাবান্না, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত অমানবিক ও অযাচিত যুদ্ধে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের তেজস্ক্রিয়ায় উত্তপ্ত হচ্ছে বায়ুমন্ডল। আর এর প্রভাব বিস্তার করছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে।
এছাড়াও খনিজ তেলের ব্যবহার এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের প্রয়োজনে যতো বেশী শিল্পকারখানা তৈরি হচ্ছে ততোই বেশি বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস বায়ুমন্ডলে নির্গত হচ্ছে, যার প্রভাবে জলবায়ুর ক্ষতিসাধন হচ্ছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৃদ্ধি পাচ্ছে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন আকষ্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঘুর্ণিঝড়, টর্নেডো, সাইক্লোন, খরা, জলোচ্ছ্বাস, দাবানল সহ নানান প্রাকৃতিক বিপর্যয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উত্তর মেরুর জমাট বাঁধা বরফ ইতিমধ্যে গলতে শুরু করেছে। দিন দিন এর মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় বরফগলা পানিতে সমুদ্রে পানির উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যার ফলাফল অচিরেই সমুদ্রের তীরবর্তী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, দ্বীপ ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলো সমুদ্র গর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম। সমুদ্র পার্শ্ববর্তী এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ফসল উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে, হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য জীববৈচিত্র্য। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীতে বেশ কিছু ধনী ও গরীব দেশ ইতিমধ্যে কমবেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যেহেতু বিষয়টি বিশ্বব্যাপী তাই একক কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব না এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কিংবা রোধ করা।
এর জন্য গোটা বিশ্বের ধনী গরীব, ছোট-বড়, অগ্রসর অনগ্রসর, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে জরুরি ভিত্তিতে একত্রে বসে কার্যকর ভূমিকা ও কর্মসূচি গ্রহণ করে সেটা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড এর মাত্রা খুব দ্রুত সময়ে শূন্যের কোঠায় আনতে হবে, বৃক্ষ রোপণ ও বনায়ন কর্মসূচিকে জোরদার করতে হবে, পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব যেনো জলবায়ুর উপর আঘাত না হানে সেইদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এই ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলার জন্য দরকার প্রচুর অর্থ যা সরবারাহ করা একমাত্র ধনী দেশগুলোর পক্ষেই সম্ভব। ইতিপূর্বে আন্তর্জাতিক সভা সেমিনার নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং পর্যাপ্ত না হলেও অর্থ সংগ্রহ হয়েছে। কিন্তু অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত গরীব এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশ কে প্রাধান্য না দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল অথচ কম ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। উল্ল্যেখযোগ্য দেশগুলো ছাড়াও আরো অনেক দেশ আছে যারা অচিরেই এই ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে। সমস্যাটা সার্বজনীন এবং বিশ্বময় তাই কর্মসূচী ও সিদ্ধান্ত নিতে হবে একত্রে সমোঝোতার ভিত্তিতে। পৃথিবী নামক গ্রহের আমরা সকলেই বাসিন্দা, বাঁচতে হবে সবাইকে সুস্থ পরিবেশে সুস্থ মননে। আসুন জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সচেতন হই, সোচ্চার হই এবং সকলের বাসযোগ্য করে গড়ে তুলি-এই মাটির ধরণীকে।
লেখক :
শাব্বীর পল্লব
গবেষক ও প্রাবন্ধিক
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/166707