পদের মোহ আর ক্ষমতার উচ্ছিষ্টতার লোভ 

পদের মোহ আর ক্ষমতার উচ্ছিষ্টতার লোভ 

বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে এখন এক অদ্ভুত লাশের গন্ধ পাওয়া যায় এবং সেই লাশটি আর কারো নয় বরং আমাদের বিবেক ও মনুষ্যত্বের। সমাজ এখন এমন এক অন্ধকার চোরাবালিতে আটকে গেছে যেখানে অন্যায় দেখে চোখ বুজে থাকাকেই ভদ্রতা কিংবা সচেতনতা বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের চারপাশের চেনা মুখগুলো আজ স্বার্থের টানে এমনভাবে বদলে গেছে যে সত্য কথা বলা মানুষগুলোকে এখন ভিনগ্রহের প্রাণী বলে মনে হয়। প্রতিটি সরকারি অফিস থেকে শুরু করে রাস্তার মোড় পর্যন্ত আজ দুর্নীতির যে মহোৎসব চলছে তার চেয়েও বড় ভয়ংকর হলো আমাদের সম্মিলিত নীরবতা। পদের মোহ আর ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট পাওয়ার জন্য আমরা যেভাবে নিজেদের নীতি বিসর্জন দিচ্ছি তা দেখে মনে হয় আমরা হয়তো মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়েছি কিন্তু মেরুদন্ডটা পথে কোথাও হারিয়ে ফেলেছি। মনুষ্যত্ব কোনো হাটে বাজারে বিক্রি হওয়ার সস্তা পণ্য ছিল না অথচ আজ আমরা নিজেরাই নিজেদের নিলামে তুলেছি। যার যত বেশি প্রভাব তার অন্যায় তত বেশি বৈধতা পাচ্ছে আর এই বৈধতার মিছিলে আমরা সবাই তালি বাজাচ্ছি। একটি স্বাধীন দেশে বাস করে যখন আমাদের প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করার আগে দশবার ভাবতে হয় তখন বুঝতে হবে সেই স্বাধীনতা আসলে এক ধরনের সুসজ্জিত জেলখানা। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন এক পৃথিবী উপহার দিচ্ছি যেখানে সত্য বলা মানেই বিপদ আর চাটুকারিতা মানেই উন্নতি। তোষামোদ আর তৈলাক্ত বাক্যের এই জয়জয়কার আমাদের জাতীয় চরিত্রকে দিন দিন নিঃস্ব করে দিচ্ছে। অথচ এই ভূখন্ডের মানুষ একসময় ন্যায়ের জন্য রক্ত দিতে দ্বিধা করত না। আজ সেই তেজ কোথায় হারিয়ে গেল তা ভাবলে অবাক হতে হয়। সাময়িক বিলাসিতা আর ব্যাংক ব্যালেন্সের লোভে আমরা যখন আমাদের আত্মাকে কলুষিত করি তখন আমরা আসলে নিজেদের অজান্তেই আত্মহননের পথ বেছে নিই। অন্যায়কারী যতটা না শক্তিশালী তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী আমাদের উদাসীনতা। যখন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি কোনো সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নেয় এবং আমরা পাশের দোকানে বসে চা খেতে খেতে সেই দৃশ্য এড়িয়ে যাই তখন আমরাও সেই অন্যায়ের সমান ভাগীদার হয়ে যাই। 

সত্যকে আড়াল করার রাজনীতি আজ সর্বত্র কিন্তু মনে রাখতে হবে সত্যের একটি ছোট স্ফুলিঙ্গই পারে মিথ্যার বিশাল পাহাড় জ্বালিয়ে ছাই করে দিতে। অর্থ আর ক্ষমতার নেশায় আমরা যদি আমাদের বিবেককে অন্ধ করে ফেলি তবে আমাদের আর বনের পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। পশু কেবল বেঁচে থাকার লড়াই করে কিন্তু মানুষের লড়াই হওয়া উচিত ন্যায়ের জন্য এবং সত্যের জন্য। সেই উচ্চতা অর্জন করতে হলে আমাদের অবশ্যই লোভকে জয় করতে হবে। অন্যায়কে অন্যায় বলাটাই হলো একজন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব আর এই শ্রেষ্ঠত্ব বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীতে টিকে থাকা অর্থহীন। আসুন আমরা এই ভীরুতা এবং হীন স্বার্থপরতা ঝেরে ফেলে সত্যের আলোয় নিজেদের উদ্ভাসিত করি, কারণ মানুষের আসল পরিচয় তার সম্পদে নয় বরং তার নির্ভীক ও আপসহীন চরিত্রের সুউচ্চ শিখরেই তা আজীবন জাগ্রত থাকে।

লেখক :

শাম্মী শফিক জুঁই

শিক্ষার্থী, ইংরেজি 
ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/166578