বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রযুক্তি

বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রযুক্তি

বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা হলো মধ্যস্বত্বভোগী, তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা। ফলে ভোক্তা যেমন ন্যায্যমূল্যে পণ্য পায় না, তেমনি কৃষকও উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম থেকে বঞ্চিত হন। সম্প্রতি সিলেটে “কৃষকের হাট” উদ্বোধনের সময় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি বলেছেন, “সিন্ডিকেটের অধীনে বাজার নিয়ন্ত্রিত হয়- এই কথা, এই স্মৃতি বাংলাদেশ থেকে বিদায় দেব।” এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে গতানুগতিক প্রশাসনিক তৎপরতার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। এক্ষেত্রে ডিপ লার্নিং, মেশিন লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বিত প্রয়োগ হতে পারে বাজার সংস্কারের কার্যকরী হাতিয়ার। 

বাজারে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক তথ্যব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাট, বাজার, আড়ত ও পাইকারি কেন্দ্রের মূল্যতথ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। এতে একটি গোষ্ঠী তথ্যের অসমতা কাজে লাগিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যদি প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন বাজার থেকে পণ্যের দাম, মজুত, সরবরাহ ও চাহিদার তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা যায়, তাহলে এআই দ্রুত বিশ্লেষণ করে কোথায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে, কোথায় অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে তা শনাক্ত করতে পারবে। এতে সরকার দ্রুত হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবে। 

কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পূর্বাভাসে মেশিন লার্নিং (এমএল) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে অনেক সময় হঠাৎ করে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যায়, কারণ আগে থেকে উৎপাদন বা ঘাটতির সঠিক পূর্বাভাস থাকে না। এমএল মডেল আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, বন্যা, মাটির অবস্থা, ফসলের রোগবালাই, আগের বছরের উৎপাদন এবং বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উৎপাদনের পূর্বাভাস দিতে পারে। এর ফলে সরকার আগেভাগে আমদানি, সংরক্ষণ বা সরবরাহ পরিকল্পনা নিতে পারবে। কৃষকরাও জানতে পারবেন কোন ফসল কোথায় বেশি লাভজনক হবে। ডিপ লার্নিং ব্যবহার করে সাপ্লাই চেইনের দুর্বলতা শনাক্ত করা সম্ভব। দেশের কৃষিপণ্য মাঠ থেকে বাজারে আসার পথে পরিবহন বিলম্ব, সংরক্ষণ সংকট, গুদাম ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অপচয়ের কারণে মূল্য বৃদ্ধি পায়। এআই-চালিত লজিস্টিকস সিস্টেম রুট অপটিমাইজেশন, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন সময় কমাতে সাহায্য করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোন এলাকায় আলু, সবজি বা চাল বেশি আছে এবং কোথায় ঘাটতি এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সিন্ডিকেটের সুযোগ কমে যাবে। বাজারে কারসাজি ও মজুতদারি শনাক্তে এআই হতে পারে কার্যকর টুল। বড় ব্যবসায়ী, পাইকার ও গুদাম মালিকদের মজুত তথ্য, আমদানি-রপ্তানি তথ্য, ট্রাক মুভমেন্ট, এমনকি ডিজিটাল লেনদেনের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক আচরণ শনাক্ত করা সম্ভব। যেমন হঠাৎ কোনো এলাকায় অতিরিক্ত মজুত, অস্বাভাবিক বিক্রি কমে যাওয়া, বা কৃত্রিম সংকটের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক অভিযান চালাতে পারবে। এতে বাজারে জবাবদিহিতা বাড়বে। কৃষক-ভোক্তা সরাসরি সংযোগ তৈরিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল কৃষকের হাট, মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস-ভিত্তিক মূল্যসেবা এবং স্থানীয় বাজার সংযোগ প্ল্যাটফর্ম চালু হলে কৃষক সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এআই এই প্ল্যাটফর্মে চাহিদা বিশ্লেষণ, ন্যায্যমূল্য পরামর্শ, ক্রেতা-সরবরাহকারী ম্যাচিং এবং ডেলিভারি সমন্বয় করতে পারে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন। ভোক্তা সুরক্ষায় এআই-ভিত্তিক অভিযোগ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা জরুরি। সাধারণ মানুষ যদি মোবাইল অ্যাপ বা হটলাইনের মাধ্যমে পণ্যের অতিরিক্ত দাম, কম ওজন বা মজুতদারির অভিযোগ জানাতে পারেন, তাহলে এআই সেই অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে পারবে। এতে বাজার তদারকি হবে আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বাজার ব্যবস্থাপনার  সফলতা নির্ভর করবে সঠিক নীতিমালা, দক্ষ জনবল, তথ্যের নির্ভুলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। এ জন্য কৃষি, বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তথ্য নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং সুশাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। ডিজিটাল রূপান্তর এখন সময়ের দাবি। বাজার ব্যবস্থায় এআই, ডিপ লার্নিং ও মেশিন লার্নিংসহ আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সিন্ডিকেটভিত্তিক কৃত্রিম সংকট, মূল্য কারসাজি ও অস্বচ্ছতা অনেকটাই কমে আসবে। তখন বাজার হবে তথ্যনির্ভর, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব। বাণিজ্যমন্ত্রীর ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রযুক্তিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সহযোদ্ধা। 

লেখকঃ

প্রফেসর ড. সামিউল আহসান তালুকদার

প্রক্টর, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি), 
সিলেট। 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/166446