বগুড়ায় বিডিজবস চাকরি মেলায় ৬৫ হাজার আবেদন: কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
নাসিমা সুলতানা ছুটু : বগুড়ায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মত সম্পন্ন হলো ‘চাকরি ও ক্যারিয়ার মেলা-২০২৬’। বিডিজবস ডটকমের আয়োজনে শহরের জামিলনগরস্থ করতোয়া কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এই মেলায় দিনভর ছিল চাকরিপ্রত্যাশী হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। এই মেলাটি কেবল চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং তরুণদের ক্যারিয়ার গড়ার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
একই ছাদের নীচে দেশের সুনামধন্য ৮২টি প্রতিষ্ঠান তাদের লোকবল নিয়োগের জন্য একত্রিত হয়েছিলো। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির পাওয়ার জন্য কীভাবে দরখাস্ত করতে হয় এবং একটি ভালো সিভি জমা দেওয়ার আগে কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে এসব নিয়ে আরও অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান এক ছাতার নিচে দাঁড়িয়েছে। এই মেলায় প্রায় ৪ হাজার প্রার্থী ৬৫ হাজার আবেদন করেছেন চাকরি পাওয়ার জন্য। চাকরি প্রার্থীদের মধ্যে যেমন ছিলেন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পেরোনো কিংবা এখনো লেখাপড়া করছেন এমন ফ্রেশাররা তেমনি ছিলেন অভিজ্ঞতা সম্পন্নরাও।
বেলা ১১টার দিকে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও সকাল থেকেই মেলা চত্ত্বরে চাকরি প্রার্থীরা ভিড় জমাতে থাকেন। শুধু বগুড়া নয় আশে-পাশের জেলাগুলো থেকেও চাকরি প্রার্থীরা এই চাকরি মেলায় এসে চাকরির জন্য আবেদন করেন। এদিকে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো স্ব স্ব স্টলে প্রতিষ্ঠানে কয়টি পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে সেইপদগুলোর নাম ব্যানারে ঝুলিয়েছেন এক পাশে। ব্যানারের আরেক পাশে প্রতিষ্টানের কিউআরকোড দেওয়া আছে। প্রার্থীরা ওই কিউআরকোড স্ক্যানার করে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে ঢুকে যোগ্যতা অনুযায়ী আবেদন করছেন।
ঢাকার ড্যাফোডিল ইউনির্ভাসিটি থেকে ত্রিপোলীতে সদ্য বিএসসি শেষ করেছেন নওগাঁর তানভীর রহমান। বগুড়ার এই জব মেলায় তানভীর ওয়ালটনসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানে সিভি জমা দিয়েছেন। সীমা খাতুন নামে আরেক চাকরি প্রত্যাশী জানান, তিনি আগে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত স্কুলে চাকরি করতেন। সম্প্রতি প্রকল্পটি শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন চাকরি খুঁজছেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে তিনি এখানে এসেছেন আবেদন করার জন্য। ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি মাস্টার্স শেষ করা লুবনা এই মেলায় এসে টিএমএসএস, গাকসহ প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন বলে জানান। বগুড়া পুন্ড্র ইউনির্ভাসিটিতে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন রংপুরের মেয়ে রুবাইয়া ইসলাম রিতু ও ফাতেমা আফরোজ। রিতু ও ফাতেমা দু’জনইই প্রাণ আর এফ এলসহ বেশ কিছু প্রতিষ্টানে সিভি জমা দিয়েছেন।
এই চাকরি প্রত্যাশীরা বলেন, একই দিনে এতগুলো বড় বড় কোম্পানিতে সরাসরি আবেদন করতে পারাটা আমাদের জন্য স্বপ্নের মতো। বিশেষ করে সিভি রাইটিং আর মক ইন্টারভিউ সেশন থেকে যা শিখেছি, তা ভবিষ্যতে অনেক কাজে দেবে। বগুড়ায় এমন বড় আয়োজন তাদের ঢাকা যাওয়ার ভোগান্তি কমিয়ে দিয়েছে বলে জানান তারা।
মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিডিজবস ডটকমের মার্কেটিং ও সেলস্ বিভাগের পরিচালক প্রকাশ রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার রয়েছেন। চাকরি পাচ্ছেন না বলে তাদের অভিযোগ। অপরদিকে দেশের চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলে তারা যোগ্য লোক পাচ্ছেন না। এই যে দুই শ্রেণির মধ্যে দুই ধরণের অভিযোগ তার অর্থ কোথাও একটা গ্যাপ রয়েছে। আর এই গ্যাপটি পূরণ করে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করাই আমাদের কাজ’। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি পাওয়া কঠিন। নিয়োগকর্তারা এখন প্রার্থীর দক্ষতা ও স্মার্টনেস দেখেন। বগুড়ার তরুণদের হাতের নাগালে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে আসার এই উদ্যোগ ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে। দক্ষ জনবলই হবে আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।
চাকরি আবেদনের পাশাপাশি এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ক্যারিয়ার বিষয়ক বিশেষ সেমিনার। ওই সেমিনারে কীভাবে আধুনিক ও যুগোপোযোগী জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি লিখতে হয় এর কলাকৌশল শেখান সিভি ইঞ্জিনিয়ার নিয়াজ আহমেদ। সেমিনারে আলোচনা করা হয় করপোরেট জগতের বর্তমান চাহিদা এবং ইন্টারভিউ বোর্ডে নিজেকে উপস্থাপনের কৌশল নিয়ে। তরুণরা এখান থেকে জানতে পারেন, একটি ভালো সিভি কীভাবে তাদের স্বপ্নের চাকরির দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে।
মেলায় বগুড়াসহ দেশের নামকরা ৮২টি প্রতিষ্ঠান তাদের স্টল সাজিয়ে বসেছিল। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল টিএমএসএস, গাক, ওয়ালটন, রাহুল গ্রুপ, লাইটহাউস, আকবরিয়া গ্রুপ এবং ইনফিনিটি। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিভিন্ন পদের জন্য যোগ্য প্রার্থী খুঁজে নিতে সরাসরি জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করে। অনেক প্রতিষ্ঠান মেলা চলাকালীনই প্রাথমিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে যোগ্য প্রার্থীদের পরবর্তী ধাপের জন্য চূড়ান্ত করে।
মেলায় গাকের শহীদুল ইসলাম জানান বর্তমানে তাদের প্রতিষ্ঠানে চারটি পদ শূন্য রয়েছে। ওই পদগুলোতে এই মেলা থেকে যে আবেদন পড়বে সেগুলোকে যদি যথোপযুক্ত মনে হয় তবে পরবর্তীতে তাদের ডাকা হবে।
মেলায় আসা তরুণদের জড়তা কাটাতে আয়োজন করা হয় ‘মক ইন্টারভিউ’ বা কৃত্রিম সাক্ষাৎকারের। এতে প্রার্থীরা অভিজ্ঞ নিয়োগকর্তাদের সামনে বসে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পান। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের দুর্বলতাগুলো বুঝতে পারেন এবং আসল ইন্টারভিউয়ের জন্য নিজেদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলার সুযোগ পান। এটি ছিল চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি অনন্য শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা। শতাধিক প্রার্থী এই মক ইন্টারভিউয়ে অংশ নেন।
বিডিজবস ডটকমের এজিএম এবং এই মেলার সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলী ফিরোজ মেলার সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাড়া পেয়েছি। মাত্র ৪ হাজার প্রার্থীর কাছ থেকে ৬৫ হাজার আবেদন জমা পড়া প্রমাণ করে তরুণরা কাজের জন্য কতটা আগ্রহী। আমরা শুধু নিয়োগই দিচ্ছি না, বরং তাদের ক্যারিয়ারের জন্য তৈরিও করছি। উত্তরবঙ্গের এই মেধাগুলোকে সঠিক পথে পরিচালিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
দিনব্যাপী এই মেলাটি ছিল বগুড়ার শিক্ষিত তরুণ সমাজের জন্য একটি মাইলফলক। আয়োজকরা আশা করছেন, এই মেলার মাধ্যমে কয়েকশ তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/166255