বাড়ছে আঞ্চলিক বৈষম্য: যেখানে টাকা ঘোরে, সেখানেই উন্নয়ন
বাংলাদেশ এগোচ্ছে এটা এখন আর বিতর্কের বিষয় নয়। শিল্পায়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির ভেতরেই একটি নীরব বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে: দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহ এখনো মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামকে ঘিরেই কেন্দ্রীভূত। সাম্প্রতিক ব্যাংকিং তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আমানতের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং ঋণের প্রায় ৬৭ শতাংশই ঢাকা বিভাগে কেন্দ্রীভূত। চট্টগ্রাম দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও ব্যবধান এখনো উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, সিলেট ও ময়মনসিংহ এই বিভাগগুলোর অংশ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অর্থাৎ দেশের আর্থিক শক্তির বড় অংশ এখনো কয়েকটি অঞ্চলের মধ্যেই আবদ্ধ। সহজভাবে বললে, দেশের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ টাকাই ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে ঘোরাফেরা করছে। ফলে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের বড় অংশও এই অঞ্চলগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ যেখানে টাকা বেশি ঘোরে, উন্নয়নও সেখানেই বেশি দৃশ্যমান হয় এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিয়ম কি সবার জন্য সমানভাবে কাজ করছে?
এর পেছনে বাস্তব কারণ রয়েছে। ঢাকায় রয়েছে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং উন্নত অবকাঠামো। একইভাবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্প কার্যক্রম গড়ে উঠেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই এসব অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেন। ব্যাংকও সেখানে বেশি ঋণ দেয়, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেশি সক্রিয়। কিন্তু এই প্রবণতার একটি কম আলোচিত দিক রয়েছে প্রান্তিক অঞ্চলের বাস্তবতা, যা উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। ধরা যাক, উত্তরাঞ্চলের একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা একটি ছোট প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়তে চান। তার জন্য একটি সহজ ঋণই হতে পারে বড় সম্ভাবনার সূচনা। কিন্তু সেই ঋণ যদি সহজলভ্য ও সুলভ না হয়, তাহলে শুধু একটি ব্যবসা নয়—একটি অঞ্চলের সম্ভাবনাই থমকে যায়। এভাবেই অদৃশ্যভাবে তৈরি হয় কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যে ব্যবধান, যার প্রভাব ধীরে ধীরে সমাজ ও অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এই বৈষম্যের প্রভাব বহুস্তরীয়। প্রথমত, সামাজিক বৈষম্য বাড়ে এক অঞ্চলের মানুষ দ্রুত এগোলেও অন্য অঞ্চলের মানুষ পিছিয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ শহরমুখী হয়। ফলে ঢাকার মতো শহরে বাড়ে যানজট, আবাসন সংকট ও পরিবেশ দূষণ; সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনৈতিকতা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়। তৃতীয়ত, স্থানীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগের অভাবে নতুন শিল্প বা উদ্যোগ গড়ে ওঠে না, ফলে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয় না। চতুর্থত, এটি রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে একদিকে কিছু অঞ্চলে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে অনেক অঞ্চলের অবকাঠামো পর্যাপ্তভাবে ব্যবহৃত হয় না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই বার্তা দেয়। বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন অপরিহার্য। অর্থাৎ উন্নয়নের সুফল যদি সমাজের সব স্তরে না পৌঁছায়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। এই বিষয়টি জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, যেখানে বৈষম্য হ্রাস, শোভন কর্মসংস্থান এবং টেকসই নগর গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন কিভাবে এই প্রবৃদ্ধিকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়।
প্রথমত, শিল্প ও বিনিয়োগকে ঢাকার বাইরে পরিকল্পিতভাবে বিস্তৃত করতে হবে। এজন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল এবং শিল্পপার্ক স্থাপনসহ অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় সহজ ও সুলভ ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য। তৃতীয়ত, সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা সমানভাবে উন্নত করতে হবে, যাতে নতুন অঞ্চলে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের জন্য বিশেষ নীতিগত সহায়তা—যেমন কর-রেয়াত বা তুলনামূলক কম সুদের ঋণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, যেখানে টাকা ঘোরে সেখানে উন্নয়ন হবে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে সেই উন্নয়ন কতটা বিস্তৃত তার ওপর। যদি প্রান্তিক অঞ্চলের গল্প উন্নয়নের মূল ধারায় জায়গা না পায়, তাহলে সেই অগ্রগতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সত্যিকার উন্নয়ন তখনই, যখন কেন্দ্রের আলো প্রান্তেও পৌঁছে এবং সেই আলোই একসময় পুরো দেশের অগ্রগতির ভিত্তি হয়ে ওঠে।
লেখক:
মোঃ ফারুক আহম্মেদ
সাবেক ব্যাংকার
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/166072