দেশের ১৩তম সিটি কর্পোরেশন হচ্ছে বগুড়া পৌরসভা, এবার উন্নয়ন বৈষম্য থেকে মুক্তি চান বর্ধিত এলাকার মানুষ

দেশের ১৩তম সিটি কর্পোরেশন হচ্ছে বগুড়া পৌরসভা, এবার উন্নয়ন বৈষম্য থেকে মুক্তি চান বর্ধিত এলাকার মানুষ

শাওন রহমান : ২০০৬ সালের ১৯ অক্টোবর ১৪.৭৬ বর্গ কিলোমিটারের বগুড়া পৌরসভাকে সম্প্রসারণ করে ৬৯.৫৬ বর্গ কিলোমিটারে উন্নীত করা হয়। তখন বগুড়া সদর ও শাজাহানপুর উপজেলার দুটি ইউনিয়নের সম্পূর্ণ এবং আরও ছয় ইউনিয়নের আংশিক এলাকা যুক্ত করে ওয়ার্ডের সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ২১টি করা হয়।

প্রায় ৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের পৌরসভার ৫৫ বর্গকিলোমিটারই বর্ধিত এলাকা। আর এই বর্ধিত এলাকার বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চল। ফলে পৌরসভার এসব এলাকার বেশিরভাগ রাস্তায় কাঁচা। পৌরসভায় কাঁচা রাস্তা মেরামতের কোন বরাদ্দ না থাকায় রাস্তাগুলোর বেশিরভাগই পাশের জমির সাথে প্রায় সমান। ইউনিয়ন পরিষদে যুক্ত থাকার সময় এসব এলাকার বেশিরভাগ রাস্তায় ইট বিছানো এবং কার্পেটিং ছিল না।

কোন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাগুলোয় পানি জমে যায়। আর সামান্য যেসব রাস্তা কার্পেটিং করা সেগুলোর অধিকাংশই খানাখন্দে ভরা। প্রায় ২০ বছর ধরে পৌরসভার যাবতীয় করসহ পৌরকর পরিশোধ করেও তারা পৌর সুবিধা দূরে থাক নূন্যতম নাগরিক অধিকারও ভোগ করতে পারছেন না। উল্টো জমি-জমার খাজনা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে জমি রেজিস্ট্রি খরচ। কিন্তু বাড়েনি জীবনমান।

এরমধ্যে বেশি দুর্ভোগের শিকার ২১নং ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডটি শাজহানপুর উপজেলার-মাদলা, বেজোড়া, বেজোড়া দক্ষিণপাড়া, হেলেঞ্চাপড়া, নিশ্চিন্তপুর, ঢাকন্তা, চকলোকমান ও মালতিনগর দক্ষিণপাড়া এবং বগুড়া সদর উপজেলার ভাটকান্দি, শ্যামবাড়িয়া, রবিবাড়িয়া, কালশিমাটি ও শেখপাড়া গ্রাম নিয়ে গঠন করা হয়। এতে ওয়ার্ডটির আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ১২ বর্গ কিলোমিটার। অথচ আগের ১২টি ওয়ার্ড মিলে পৌরসভার আয়তন ছিল ১৪ বর্গ কিলোমিটার।

বর্ধিত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত পৌরকর দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ ২০ বছরেও ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি। অধিকাংশ সড়ক কাঁচা হওয়ায় নিত্য যাতায়াতে, বিশেষ করে বর্ষাকালে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সড়কগুলোতে কোনো বাতি না থাকায় রাত নামলেই ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। নাগরিক এসব সমস্যা সমাধানে বর্ধিত এলাকার ৯টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা কয়েক দফা আন্দোলনও করেন। এতে প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই মেলেনি।

তারা বলছেন, বগুড়া পৌরসভার মোট সড়কের প্রায় অর্ধেক এখনও কাঁচা। সড়ক বাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর অন্ধকারে ডুবে থাকে ৮০ শতাংশ এলাকা। বর্ধিত ৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ২০ বছর আগে পৌরসভায় অন্তর্ভুক্ত এই এলাকার মানুষ কাগজে-কলমে পৌরসভার বাসিন্দা হলেও ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। অন্তর্ভুক্তির পর থেকে বর্ধিত এলাকার বসতবাড়িতে হোল্ডিং কর আদায় শুরু করে কর্তৃপক্ষ। অকৃষি জমিও আনা হয় করের আওতায়। তবে বাড়েনি নাগরিক সেবা। জীবনমান গ্রামের থাকলেও বিভিন্ন খরচ পরিশোধ করতে হয় পৌর বা নগর জীবনের মতো।

বর্ধিত এলাকার শ্যামবাড়িয়া এলাকার স্কুলশিক্ষক নূর ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পৌরসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে তাদেরকে কয়েকগুণ বেশি কর দিতে হচ্ছে, বিনিময়ে তারা কিছুই পাননি। এর চেয়ে ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দা হয়ে থাকলে উপজেলা পরিষদ থেকে উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ পাওয়া যেত, তাতে সড়কগুলো অন্তত পাকা হতো। তবে এবার আমরা আশা করছি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উন্নয়ন বঞ্চিত বর্ধিত এই এলাকার দিকে সুনজর দিবেন।

একই এলাকার ব্যবসায়ী আতাউর রহমান বলেন, পৌরসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে ট্রেড লাইসেন্স ফি ও কর বেঢ়েছে, কিন্তু এর বিপরীতে কোন সুবিধা বাড়েনি। এছাড়াও এই এলাকার একটি রাস্তাও পাকা হয়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় যে আধাকিলোমিটর রাস্তা পাতা হয়েছেও তাও সংস্কারের অভাবে চলাচলের অনুপযোগী।

ঢাকন্তা গ্রামের কৃষক ফরহাদ হোসেন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে বসতবাড়ির জন্য প্রতি শতকে দেড় টাকা হিসাবে কর আদায় করা হতো। পৌরসভা হওয়ার পর তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে আদায় করা হচ্ছে। কর কমানোর জন্য কয়েক দফা আন্দোলন, মামলা করেও খুব একট ফল হয়নি। তিনি আরও বলেন, আমাদের এলাকা ইউনিয়ন থেকে পৌরসভায় রূপান্তর হলেও শুধু করের পরিমাণ বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো পরিবর্তন চোখে পড়লো না।

সিটি কর্পোরেশন হলে এবার যেন সব এলাকায় সমউন্নয়ন হয়, না হলে আবার আন্দোলনে নামতে হবে।   কালশিমাটি গ্রামের পল্লি চিকিৎসক রঞ্জু ইসলাম বলেন, শুধু কাগজে-কলমে এতো দিন পৌরসভায় ছিলাম, কোন সুযোগ-সুবিধা মেলেনি। এখন সিটি কর্পোরেশন হচ্ছে। উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়বে, আশা করছি এবার অন্তত বৈষম্য দূর হবে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/165742