বগুড়ায় চার কোটি টাকার বার্ন ইউনিট ছয় বছর ধরে তালাবদ্ধ
হাফিজা বিনা : গত ২৪ মার্চ সকালে দুই বছরের শিশু রাইসা আক্তার তার পাঁচ বছর বয়সী ভাইয়ের সাথে দিয়াশলাই নিয়ে খেলা করছিল। এক পর্যায়ে দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালানোর সময় কাঠির আগুন শিশু রাইসার গায়ের জামায় এসে পড়লে আগুন ধরে যায়। এতে তার প্রায় পুরো পিঠের ৬০ অংশ পুড়ে যায়। এঘটনার পরপরই রাইসাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৮ এপ্রিল ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
বর্তমানে সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে। কাহালু উপজেলার সাকোহালী গ্রামের রবিউল ইসলামের অগ্নিদগ্ধ শিশু কন্যা রাইসার চিকিৎসা চলছে মানুষের অনুদানে। তিনি বলেন, যদি বগুড়াতে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতো তবে তাকে ঢাকায় ছুটতে হতো না।
একই কথা জানান, বগুড়ার মালগ্রাম এলাকার গৃহবধূ কল্পনা। তাদের ওপর অভিমান করে অনার্স পড়ুয়া ছেলে এমরান গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। যখন তারা টের পান তখন ছেলের মুখমন্ডল থেকে পেটের ওপর পর্যন্ত পুড়ে যায়। তারা তাকে নিয়ে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু সেখানে আগুনে পোড়া রোগীর চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
সেখান থেকে এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি করানোর আগেই ছেলে কথা বলা বন্ধ করে দেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যদি বগুড়ায় এমন রোগীদের জন্য একটা বিষেশায়িত হাসপাতাল থাকতো তবে অন্তত বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারতাম।
এমন করেই প্রতিদিন বগুড়াতো বটেই বগুড়ার আশেপাশের জেলা শহর থেকেই আগুনে পোড়া রোগী আসেন বগুড়ায়। বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দু’টি কক্ষে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। বেশি ক্ষত বা বেশি পোড়া রোগীদের ঝুঁকি নিয়ে হয় রাজশাহী নয়তো ঢাকা বার্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
বৃহৎ এই জনগোষ্ঠির চিকিৎসাসেবার জন্য বগুড়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ২০১৮ সালে ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ শয্যার একটি আধুনিক বার্ন ইউনিট নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ভবনটি ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে সব কাজ শেষ হয় এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে জেলা গণপূর্ত বিভাগ।
এরপর অবকাঠামো নির্মাণ কাজ সম্পন্নের ছয় বছর অতিক্রান্ত হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং বিশেষজ্ঞ জনবল না থাকায় এটি আজও চালু হয়নি। এতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ পোড়া রোগীদেরও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, না হয়-ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইউনিটে দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে অনেক সময় পথেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। এতে বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বার্ন ইউনিট চালুর জন্য হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) বেড, ভেন্টিলেটর ও মনিটর স্থাপনের কাজ শেষে পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট চালুর জন্য মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল প্রশাসন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে হস্তান্তরের পরপরই একটি চাহিদাপত্র পাঠানো হয়।
এতে বার্ন ও সার্জারি বিষয়ে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, বার্ন ও সার্জারির দুইজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, দুইজন সহকারী রেজিস্ট্রার, চারজন আইএমও (ইনডোর মেডিকেল অফিসার), চারজন চিকিৎসা কর্মকর্তা, দুইজন অচেতনবিদ, ১৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স, ১২ জন অফিস সহায়ক, ১২ জন ওয়ার্ড বয় এবং আটজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ সৃষ্টির আবেদন করা হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মজিদুল ইসলাম বলেন, বার্ন ইউনিট স্থাপনের জন্য ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে নবনির্মিত ভবন হস্তান্তর করা হয়। এতে বার্ন ইউনিটের জন্য ১০ শয্যাবিশিষ্ট দু’টি বিশেষায়িত ওয়ার্ড, অস্ত্রোপচার কক্ষ, পর্যবেক্ষণ ইউনিট, চিকিৎসকদের বিশ্রামকক্ষ, কর্তব্যরত চিকিৎসকদের চেম্বারসহ নানা সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে।
ভবন বুঝে নেয়ার পর থেকেই বার্ন ইউনিট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, অস্ত্রোপচারকক্ষসহ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চেয়ে হাসপাতাল থেকে কয়েক দফা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত চিকিৎসক, সেবিকা ও স্বাস্থ্যকর্মীর পদ সৃষ্টি করা হয়নি। কোনো যন্ত্রপাতিও বরাদ্দ মেলেনি। মাঝে কোভিডের সময় এই ইউনিটটি রোগীদের আইসিইউ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সর্বশেষ তিনি একটি চিঠি পাঠিয়েছেন তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, গত কয়েক বছর হলো এই ইউনিটটি বন্ধ আছে। যদিও একটি বার্ন ইউনিট পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের অন্য বিভাগের যে সুবিধা পাওযা যায় তা এখানে নেই। সেক্ষেত্রে সরকার এটাকে বার্ন ইউনিট হিসেবে চালু করুক নয়তো এখানকার আইসিইউ, সিসিইউ ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করুক।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/165715