বগুড়ায় ৬ মাস ধরে জলাতঙ্ক টিকা বন্ধ, রোগীদের হাহাকার

বগুড়ায় ৬ মাস ধরে জলাতঙ্ক টিকা বন্ধ, রোগীদের হাহাকার

নাসিমা সুলতানা ছুটু : বগুড়ার প্রধান জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে প্রায় ছয় মাস থেকে অ্যান্টি-র‌্যাবিস ভ্যাকসিনের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সরকারিভাবে সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত রোগী জীবনরক্ষাকারী এই টিকা না পেয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

ফলে কুকুর বা বিড়ালের মতো প্রাণীর কামড়ে আহতদের বাইরে থেকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে টিকা। অ্যান্টি-র‌্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট প্রায় দেড় বছর থেকে দেখা দিলেও গত নভেম্বর থেকে একেবারে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এদিকে বাসা বাড়িগুলোতে বিড়াল ও কুকুর পালনের ফলে দিন দিন এই ভ্যাকসিনের চাহিদা আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে বলে দাবি করছেন চিকিৎসকরা।

হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্রে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গড়ে ৮০ জন নতুন ও পুরাতন রোগী ভিড় করেন। কিন্তু গত পাঁচ মাস ধরে হাসপাতাল স্টকে এআরভি ও আরআইজি ভ্যাকসিনের সরবরাহ নেই। ফলে কুকুর বা বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে আসা রোগীদের বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনে আনতে হচ্ছে। চিকিৎসকের পরামর্শে চারজন রোগী একত্রিত হয়ে একটি করে ভায়াল কিনে টিকা নিচ্ছেন।
গতকাল শনিবার বেলা ১২টায় হাসপাতালের মাল্টিপারপাস ভবনের স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় প্রায় ৩০-৪০ জন রোগী র‌্যাবিস ভ্যাকসিন নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা থেকে মায়ের সঙ্গে র‌্যাবিস ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ নিতে এসেছে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফরিন আক্তার ঈসা। বাসার পালিত বিড়াল ঈসার হাতে কয়েকদিন আগে আচড় দিয়েছিল। ডাক্তারের পরামর্শে ১৫ এপ্রিল প্রথম ডোজ নিয়েছে। আজ দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে, এরপর ২২ এপ্রিল তৃতীয় ডোজ নিতে হবে। এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জিনিয়াও বাসার পোষা বিড়ালের আচড় দেওয়ায় ভ্যাকসিন নিতে শিবগঞ্জ থেকে এসেছেন। কুড়ি মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পরও শেয়ারে ভ্যাকসিন কিনতে পারেননি।

জিনিয়া বলেন, অন্য রোগীদের সঙ্গে বাড়ি থেকে কেউ না কেউ আসায় তারা সহজেই ভ্যাকসিন কেনার পাটনার পাচ্ছেন। কিন্তু আমি এখনো কাউকে পাইনি। প্রতিবেশীর পালিত কুকুর হাঁটুর নিচে কামড়ে প্রায় মাংস উঠিয়ে নিয়েছে ষাটোর্ধ্ব মাধবীর।

ছেলের সঙ্গে আসা মাধবী জানান, তার ছেলে ভ্যাকসিন কিনতে গিয়েছে। যেহেতু তার মাংস উঠিয়ে গেছে এজন্য চিকিৎসক বলেছেন, তাকে একাই একটি ভ্যাকসিন দিতে হবে। মাধবী বলেন, আমরা গরিব মানুষ, টিকা কিনতে এতো টাকা কোথায় পাবো? আমাদের জন্য এটা বোঝা হয়ে যায়। সরকারি হাসপাতালে টিকা না থাকায় বাইরের ফার্মেসিগুলোতে এআরভি ভ্যাকসিন কিনতে ৫শ ও আরআইজি কিনতে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।


হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ওই হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্র থেকে ২১ হাজার ৪৩৬ জন রোগী অ্যান্টি র‌্যাবিস ভ্যাকসিন নিয়েছেন। এরমধ্যে শুধু কুকুরে কামড়ের ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৫ হাজার ১০৯ জন এবং বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর কামড়ের জন্য ভ্যাকসিন নিয়েছেন ১৬ হাজার ৩২৭ জন। প্রতি মাসে ভ্যাকসিনের চাহিদা ৬শ’ ভায়াল। অথচ প্রায় ৬ মাস থেকে অ্যান্টি র‌্যাবির ভায়ালের সরবরাহ একেবারে বন্ধ রয়েছে। এর আগে দুই তিন মাস পরপর ৫শ’ ভায়াল সরবরাহ করা হতো বলে সূত্র জানিয়েছে।

বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুজিদুল ইসলাম জানান, গত নভেম্বর থেকে হাসপাতালে অ্যান্টি র‌্যাবিস ভ্যাকসিন সরবরাহ একেবারে বন্ধ রয়েছে। এর আগে ২/৩ মাস পরপর ৫শ’ ভায়ালের সরবরাহ হতো, যা রোগীর তুলনায় একেবারে কম। প্রতি মাসেই প্রায় ৬শ’ ভায়ালের চাহিদা রয়েছে। হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০জন রোগী আসছেন।

এদের প্রায় ৯০ ভাগই পোষা বিড়াল-কুকুরে আক্রান্ত। বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়ালের কামড়ে বা আচড়ে আসা রোগীর সংখ্যা খুবই কম। তিনি আরও বলেন, মানুষের এখন সৌখিনতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাড়িতে বেড়াল ও কুকুর পোষা। শহরের বেশিরভাগ বাড়িতেই এখন বিড়াল এবং কুকুর পোষা হয়। এমন কী এই প্রবণতা গ্রামে বসবাসকারীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।

গত এক দশকে এই প্রবণতা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ফলে হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টি র‌্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট প্রকট আকারে দেখা দিচ্ছে। ডা. মুজিদুল বলেন, অতিদ্রুত ভ্যাকসিনের সরবরাহ আসবে। সরকারিভাবে এটা কেনার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/165579