কুঁড়ি: শিশু-কিশোরদের সৃজন কর্মের এক অনন্য সংগঠন

কুঁড়ি: শিশু-কিশোরদের সৃজন কর্মের এক অনন্য সংগঠন

শিশু-কিশোরদের মানস গঠন,সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে তাদের সাহিত্য চর্চার সুযোগ থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। শৈশবে পঠিত ও রচিত সাহিত্য শিশু-কিশোরদের ব্যক্তিত্ব গঠন, সৃজনশীল ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি ও সুনাগরিক হয়ে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অপরিসীম প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তক কেন্দ্রিকতা, কোচিং নির্ভরতা ও  সৃজনশীলতার চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর প্রাপ্তির দিকটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাহিত্য চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার মতো অপরিহার্য অনুষঙ্গটি বহুদিন ধরেই সংকুচিত হয়ে রয়েছে। অথচ চারপাশে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে-শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যতে যোগ্য ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে রয়েছে নানা ধরনের শিশু সংগঠন। এর মধ্যে বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের সাহিত্য চর্চাকে প্রধান উপজীব্য করে গড়ে ওঠা শিশু সংগঠনগুলোর উদ্দেশ্য থাকে-শিশু-কিশোরদের ছড়া, কবিতা, গল্প, নিবন্ধ ইত্যাদি লেখায় উৎসাহিত করে তাদের মননশীলতা ও হৃদয়বৃত্তিকে প্রস্ফুটিত করার চেষ্টা, যা তাদের মানবিক গুণাবলী বিকাশে সহায়ক হয়ে সৃজনশীল ভাবনা ভাবতে উদ্বুদ্ধ ও যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে। এদেশেও শিশু কিশোরদের এ ধরনের সংগঠন ও পত্রিকা প্রকাশের গুরুত্ব অনুভূত হলেও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক পরিবেশ, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও শিশু কিশোরদের সৃজনশীল কাজের প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগের অভাব, বিশেষ করে আর্থিক সীমাবদ্ধতার  কারণে শিশু সংগঠনগুলো জাতীয় ও আঞ্চলিকভাবে শক্ত অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি বা পারছে না। এই বাস্তবতায় দেশের অনেক কৃতি কবি ও সাহিত্যিকের পীঠস্থান বগুড়াতে শিশু-কিশোরদের সংগঠন ‘কুঁড়ি’র সাহসী পথচলা শুরু হয় ২০১৭ সালের ০৮ ফেব্রুয়ারিতে। বিশিষ্ট ছড়াকার ও শিশু সংগঠক আব্দুল খালেকের উদ্যোগে এ সংগঠনটির গোড়াপত্তন ঘটে এবং ফুল হয়ে ফুটতে যাওয়া শিশু-কিশোরদের সমার্থক ‘কুঁড়ি’ নামকরণে এগিয়ে আসেন বগুড়ার সাহিত্য অঙ্গনের বাতিঘর ও শিশুসাহিত্য প্রেমিক প্রবীণ কবি ও প্রাবন্ধিক বজলুল করিম বাহার, যিনি এখনও সংগঠনটিকে প্রেরণা যুগিয়ে চলেছেন। সংগঠনটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে ৯টি বছর অতিক্রম করে এবার ১০ম বর্ষে পদার্পণ করেছে। সংগঠনটি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়-কুঁড়ির প্রধান দুটি দিকের একটি হলো-স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের সাহিত্য চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে তাদের ও বড়দের লেখা নিয়ে প্রতি মাসে কুঁড়ি পত্রিকা প্রকাশ করা। দীর্ঘ নয় বছরের পথচলায় এ নিয়মের কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। একটি জেলা শহর থেকে এ ধরনের ব্যয়সাপেক্ষ মাসিক পত্রিকা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে যাওয়া যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হলেও বগুড়ার শিশু-কিশোর হিতৈষী বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব টিএমএসএস এর নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড.হোসনে আরা বেগম, দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মোজাম্মেল হকসহ অনেকের পৃষ্ঠপোষকতা, উপদেষ্টাবৃন্দের দিক-নির্দেশনা এবং কুঁড়ি’র পরিচালনা পরিষদের আন্তরিক সহযোগিতার ফলেই সম্ভব হয়েছে কুঁড়িকে অব্যাহতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। স্থানীয় ও দেশ বরেণ্য শিশু সাহিত্যিকদের লেখা কুঁড়িতে স্থান পাওয়ায় কুঁড়ি এখন দেশের বিশিষ্ট শিশুতোষ লেখকদের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত ও প্রশংসনীয় একটি নাম। কুঁড়ি শুধু গল্প, কবিতাই নয়,এটিতে শিশু আঁকিয়েদের চিত্রাংকনও স্থান পায়। তাদের উৎসাহিত করতে প্রতিটি সংখ্যায় একজন সেরা শিশু আঁকিয়ের চিত্রাংকন কুঁড়ির প্রচ্ছদ হিসেবে প্রকাশ করা হয়,যা এ দেশের আর কোন শিশু পত্রিকায় লক্ষ করা যায় না। কুঁড়ির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো-শিশু কিশোরদের শুধু ছড়া, গল্প লেখা ও অংকনই  নয়,কী কৌশলে এ ধরনের সৃজন কর্ম মানসম্মতভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা হাতে-কলমে শিশু-কিশোরদের শিখিয়ে দেয়ার জন্য প্রতি বছরে বিষয়ভিত্তিক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। বগুড়ার প্রধান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনেক আগ্রহী শিক্ষার্থী এসব কর্মশালায় অংশ নিয়ে থাকে। এছাড়া রয়েছে প্রতি মাসে মাসিক সাহিত্য আসর। এ আসরে অংশগ্রহণকারী  শিক্ষার্থীরা যে কোন বিষয়ের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ছড়া ও গল্প রচনা করে এবং একই সাথে প্রতি মাসে প্রকাশিত কুঁড়িপঠন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত লিখন এবং বই ও পত্রপত্রিকা পঠনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। গত বছর থেকে কুঁড়ির উদ্যোগে চালু করা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সাহিত্য আসর। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় একটি পিরিয়ডে আয়োজিত এসব আসরে  শিক্ষার্থীদের সাহিত্য চর্চায় উৎসাহিত করে তাদের কুঁড়ির সাথে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি কুঁড়ি কর্তৃপক্ষ কুঁড়ির এই সৃজনশীল কার্যক্রম শুধু বগুড়া শহরে সীমিত না রেখে উপজেলাগুলোতেও ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে,যার আশাব্যঞ্জক সাড়াও মিলছে বলে জানিয়েছেন কুঁড়ি কর্তৃপক্ষ। তাঁরা আরো জানান, কুঁড়ির এই সাহিত্য চর্চাভিত্তিক  কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে শতাধিক শিশু-কিশোর এবং সেই সাথে সম্মানিত অভিভাবকগণও। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্যে অভিভাবকদের নিজেদের সন্তানদের সাহিত্যকর্মের মতো দুরূহ অভিযাত্রায় যুক্ত করার অভিপ্রায়ই মূলত কুঁড়ির অগ্রযাত্রার মূল চালিকা শক্তি। শিশু কিশোরদের সৃজনশীলতা বিকাশের অনন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান কুঁড়ির নবম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী কুঁড়ি উৎসব অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৭ এপ্রিল, শুক্রবারে। কুঁড়ি উত্তরোত্তর এগিয়ে যাবে শিশু-কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের উজ্জ্বল সারথী হয়ে-এ প্রত্যাশা এখন করা যেতেই পারে।    
লেখক ঃ

রাহমান ওয়াহিদ

কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/165312