পহেলা বৈশাখ আমাদের শেকড়ের উৎসব

পহেলা বৈশাখ আমাদের শেকড়ের উৎসব

পহেলা বৈশাখ বাঙালীর শেকড় ও সত্তার এক হরিদ্রাভ উৎসব। নান্দনিক শিমুল পলাশ মাধবীলতা পারিজাত গন্ধরাজের ঘ্রাণ। বাংলা বছরের প্রথম মাস। আমার বৈশাখ। শত শত বৎসরের বাঙালীর জীবন সংস্কৃতি ও কৃষ্টির উৎসব এই বৈশাখ।পুরনো দিনের জঞ্জাল সরিয়ে আবার এসেছে বৈশাখ।এসেছে নববর্ষ। বৈশাখের রুদ্র সন্ন্যাসী। বৈশাখ আনে মঙ্গল আলোক। আনে নবচেতনা। তোমাকে স্বাগত জানাই হে পহেলা  বৈশাখ। বাংলা নববর্ষে বৈশাখের প্রথম দিনে দোকান কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নতুন হিসাবের খাতা, এই হালখাতা আমাদের বাঙালীর এক উৎসব। পহেলা বৈশাখ বর্ষ গণনা আমাদের গ্রামের জনগোষ্ঠীর জীবন আচরণের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত হলেও শহুরে জনগোষ্ঠীর আমরা অনেকেই বাংলা মাসের তারিখ হিসাব জানিনা অথবা রাখিনা। ক্যালেন্ডারের পাতায় পঞ্জিকার পাতায় প্রয়োজনে বাংলা মাস বা তারিখ খোঁজ করি। এই অজ্ঞতা অক্ষমতা আমাদের আর কত দিন ধরে রাখব? পহেলা বৈশাখে মাত্র একটি দিনের জন্য খাঁটি বাঙালী হবার চেষ্টা করি। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে কড়কড়ে ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবী অথবা শাড়ী পরে মাটির সানকিতে পান্তার সঙ্গে ইলিশ ভাজি খাই, আহা! কী সুন্দর এই বাঙালী সাজবার অভিনয়। বৎসরের প্রথম দিনে এই মিথ্যে ভড়ং আর কতকাল!

আবহমান বাংলার কালপঞ্জিতে প্রতি বছর বৈশাখ আসে। ডাক দেয়। বাঙালি অপেক্ষায় থাকি সেই ডাকের। তাকে বরণ করি হৃদয়ের অর্ঘ্য দিয়ে। নববর্ষ ও বৈশাখকে স্বাগত জানাতে আয়োজন হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। চলে নাচ, গান, বের হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, বসে রকমারি পণ্যের মেলা। পহেলা বৈশাখ গৎ বাঁধা বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে বৈচিত্র্যের স্বাদ। পত্র-পত্রিকাগুলো বের করে বিশেষ ক্রোড়পত্র। ইলেক্ট্রনিক প্রচার মাধ্যমগুলো সম্প্রচার করে বিশেষ অনুষ্ঠান। বাঙালী আর বাংলাদেশী এই তর্ক বিতর্কের মধ্যে আমরা পেজগীতে আটকে আছি বহুকাল। পরিবর্তিত বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সময়ে এই বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত। অশুভশক্তি মুক্তবুদ্ধির চর্চা বিঘ্নিত করছে বার বার। পহেলা বৈশাখে নাশকতা করেও প্রাণের উৎসব বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি। শেকড় আর উৎস থেকে বাঙালীকে ভ্রষ্ট করবার অপচেষ্টা আর নয়, ঢোলের ডাকে প্রাণের উৎসবে জেগেছে বাঙালী। অশুভ অকল্যাণ দূর হয়েছে আজ। ‘দিন বদলের মঞ্চ দিচ্ছে ডাক। বাঙালী এবার জাগরে জাগ’। হাজার বৎসর পূর্বে থেকে কৃষিকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা বাঙালীর জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে আছে বৈশাখ। খাজনা আদায় ও ঋণ পরিশোধ ভূ-স্বামীদের পুণ্যাহ উৎসব বাংলা নববর্ষের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য প্রবর্তন করেন বাংলা নববর্ষ। সেই থেকে শুরু এই বৈশাখ উৎসব। বর্ষবরণ উৎসব। নতুন জামা কাপড় পরা। বাড়ী বাড়ীতে উন্নত রান্নার আয়োজন। নববর্ষের দিনে ভাল কিছু খেলে সারাটা বৎসর ভাল খাদ্য জুটবে বাঙালীর এটি একটি লোকজ বিশ্বাস। বৈশাখী মেলা ও বর্ষবরণ একই সূত্রে গাঁথা। বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে এই বৈশাখী মেলা কবে কোথায় প্রথম শুরু হলো তা কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করে পাওয়া যায় না। জারি গান, কবিগান, লসিমন পালা, বাউল গান, লাঠি খেলা, পুতুল নাচ, নৌকা বাইচ, মোরগ লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই, মিষ্টির দোকান, নাগর দোলা, শিশু-কিশোরদের খেলনা, প্রসাধন, নকশিকাঁথা, গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি যেন এই বৈশাখী মেলা। কুমারদের মাটির হাড়ি-পাতিল খেলনা মেলার ঐতিহ্যের এক অংশ। ১৩৭৪ সালের পয়লা বৈশাখ (১৯৬৭ সাল ইং) ছায়ানট রমনা বটমূলে ব্যাপকভাবে বড় পরিসরে বর্ষবরণ প্রভাতী অনুষ্ঠান শুরু করে। শুদ্ধ সঙ্গীত চর্চার এক অদ্ভুত আনন্দ উৎসব। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, রজনীকান্তের গান, লোকসঙ্গীত, ছোট বাচ্চাদের ফুল ছড়ানো বর্ষবরণের নৃত্য এবং আবৃত্তি ছায়ানটের এই অনুষ্ঠান খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠল। এর প্রভাব পড়ল সারা বাংলাদেশে। সমগ্র দেশের জেলা শহর, উপজেলায়, গ্রামে ছায়ানট ধাঁচের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। বোমাবাজী প্রাণহানি ঘটিয়েও বন্ধ করা যায়নি বাঙালীর প্রাণের উৎসব। পয়লা বৈশাখে শোভা-যাত্রা ঠিক কবে থেকে শুরু হয় তা জানা যায়নি। অকল্যাণ ও অশুভকে দূর করার জন্য  শোভাযাত্রা বৈশাখের আর এক মহৎ উৎসব। চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন বর্ণিল মুখোশ হাতি-ঘোড়া বানিয়ে এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করে থাকে। রাজধানীসহ প্রতিটি জেলা শহরে পহেলা বৈশাখে এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দুধর্মের আচার-উৎসব নানারকম পূজা-পার্বণও ছিল নববর্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত, চৈত্র সংক্রান্তি ও পুণ্যাহ ছিল প্রধান উৎসব নববর্ষে।

পুরাতন বৎসরের হতাশা গ্লানি মুছে যাক শান্তির ছায়াতলে, আসুক পয়লা বৈশাখ, শুরু হোক চেতনা শাণিত নতুন বছর, কল্যাণের লাবণ্য ভরা, সমৃদ্ধি আর সম্ভাবনার নতুন দিন। “দিন আসবে দিন আসবে, দিন সমতার, দিন সম্ভাবনার” নতুন বর্ষে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। কল্যাণের লাবণ্য ঝরুক প্রতিটি নাগরিকের প্রাণে।

 

মাহমুদ হোসেন পিন্টু

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/165195