বাঙালির আত্মপরিচয়ের দিন

বাঙালির আত্মপরিচয়ের দিন

আজ পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। শুভ বাংলা নববর্ষ। ১৯৬৮ সাল থেকে রমনার বটমূলে নানা উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বাংলা  নববর্ষ বরন শুরু হয় যা আজও অব্যহত রয়েছে। তাই বাংলা নতুন বছর এলেই বাঙালির প্রাণে দোলা দেয়, এসো এসো হে বৈশাখ, এসো এসো এই আহ্বানে ও মধ্যদিয়ে। শুভ নববর্ষে ও পহেলা দিনটি মূলত বিগত দিন, পুরানো সকল জঞ্জাল, অপূর্ণতা সরিয়ে দিয়ে জীবনের সকল ক্ষেত্রে পূর্ণতা আনার লক্ষ্যে প্রাণশক্তিতে তেজোদীপ্ত হওয়ার দিন। অঙ্গীকারের দিন। 

বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতির ঐতিহ্য। বাঙালির রয়েছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক পরিচয়। প্রত্যেক জাতীর জাতীয় সম্মান ও আশা, আকাঙ্খার প্রতীক যেমন তার মাতৃভাষা,তেমন মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ইঠেছে বাঙালির সংস্কৃতি। তাই আবহমান কাল থেকে আমরা বাংলা নববর্ষকে বরন করি নানা উৎসবের মধ্যদিয়ে। আর এ সব উৎসব পালন করে বাঙালি তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক টানে। হালখাতা, বৈশাখী মেলা, নাচ, গান, মঞ্চ নাটক, পথ নাটক, আবৃতি. চিত্রকলা, প্রদশর্নী ও মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করা হয়। আর এসবের মধ্য দিয়ে আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকশিত হচ্ছে। এগিয়ে চলেছে আমাদের সাস্কৃতিক ধারা। এগিয়ে যাচ্ছে সময়ও জীবন। জীবন স্থির নয়। চলমান জীবনে বাহ্যিক রূপই সংস্কৃতি। তাই বাঙালি তার সাংস্কৃতিক ধারাকে গতিশীল করার জন্য নানা উৎসবের আয়োজন করে। কিন্তুু আয়োজনে অতীতে বাধা আসলেও তা ব্যাহত করতে পারেনি। সকল বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে বাঙালির এই সাংস্কৃতিক ধারা আরো শক্তিশালী ও বেগবান হয়েছে। নববর্ষের বিভিন্ন উৎসব, আনন্দ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাঙালির আত্ম পরিচয়ের দিকটি ফুটে উঠে। আমাদের আত্মপরিচয় যত ব্যাপক হবে ততই বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব বাড়বে। আমাদের নিজস্ব পরিচয়ের ধারাটি যত বেগবান, ততই চলার পথ সহজ হবে। 

পহেলা বৈশাখ আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিষ্ঠিত দিন। তাই এটি  হয়েছে বাঙালির জাতীয় উৎসব। আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা এনে দিয়েছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও স্বাধীন বাংলাদেশ। এটা যেমন ধ্রুব সত্য তেমনি সকল প্রকার সংকীর্ণতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কাছে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা কখনও পরাজিত হয়নি। আমাদের চলার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। নিজস্ব প্রান শক্তিতেই আমাদের চেতনা বিকশিত হয়েছে। আজ সারা দেশে পহেলা বৈশাখের রঙ-বেরঙের উৎসবই তার প্রমান। বাংলা ১৪৩২ আমাদের কাছ থেকে বিদ্য়া নিল। শত চেষ্টা করলেও আমরা বিগত দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারব না। অতীত বছরে আমরা যা অর্জন করিতে পারিনি সে ব্যর্থতা গ্লানীকে চলতি বছরে মুছে দেওয়ার জন্য আমাদের সচেষ্ট থাকতে হবে।

নতুন বছরের শুভাগমনে আমরা সন্ত্রাসও দুর্নীতি মুক্ত সমাজ কামনা করি। কামনা করি সেই সমাজে, যে ,সমাজে থাকবেনা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ। সকল প্রকার ধর্মীয় গোঁড়ামির উর্ধ্বে  থেকে একে অপরের সম্প্রতির বন্ধনে আবদ্ধ হতে জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনে অবদান রাখতে হবে। পরাধীন শাসনে অর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায়  আমরা দরিদ্র ছিলাম। কিন্তু এখন ত আমরা পরাধীন নই।স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও একটি জাতি সন্ত্রাস, দূর্নীতিও দারিদ্রের বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে এমনটি আশা করা যায় না। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের । আমাদের কী নেই? আমাদের যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে। শক্তিশালী যুব সমাজ রয়েছে। নববর্ষেও সুচনা লগ্নে যুগোপযোগী ও বাস্তব পরিকল্পনা নিয়ে এই সম্পদ ও অমিত শক্তি যুব সমাজকে দেশের উন্নয়নের লক্ষে লাগাতে হবে। তাহলে আমাদের দেশ জাতি সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাবে। 

আসুন, নতুন বছরের শুভ প্রভাতে দেশের কল্যানে আমরা মানবতা, সামাজিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, দূর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা কল্পে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতাবোধ যেমন জরুরী তেমনি সকল মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্য সম্পৃতি  ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দেশ ও জাতির উন্নয়নে অবদান রাখি। এই প্রত্যাশায় উজ্জীবিত হয়ে বাঙালির আত্মপরিচয় নববর্ষ বরণের এই ক্ষনে আমরা স্বাগত জানাই বাংলা নববর্ষকে। শুভ নববর্ষ। 

লেখকঃ

মোহাম্মদ নজাবত আলী

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক
দুপচাঁচিয়া, বগুড়া।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/165192