বগুড়ায় তৎপর বিপজ্জনক ‘আইস’ পাচারকারী চক্র, ক্রেতা বিত্তশালীদের সন্তান

বগুড়ায় তৎপর বিপজ্জনক ‘আইস’ পাচারকারী চক্র, ক্রেতা বিত্তশালীদের সন্তান

স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়াকে কেন্দ্র করে বিপজ্জনক নতুন মাদক ‘ক্রিস্টাল মেথ বা আইস’ কারবারি চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রে নারী সদস্যও রয়েছে। ইতোমধ্যে আইয়ুব নামে এই চক্রের এক সদস্য ৩০ গ্রাম আইসসহ ধরা পড়লেও অন্যান্য সদস্যরা রয়েছে অধরা। আইয়ুব বাহক মাত্র। নেপথ্যে থাকা গডফাদারের সন্ধান পায়নি পুলিশ।

বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে আইসের কারবার চালাতেন এক নারী। আইয়ুব ধরা পড়ার পর থেকে ওই নারী লাপাত্তা। বাড়ির দরজায় তালা ঝুলিয়ে পালিয়েছেন তিনি। তবে গোয়েন্দা পুলিশ তার নাম ঠিকানা জানতে পেরেছে। পরিচয় উদঘাটনের পর গোয়েন্দারা তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে।

জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি মো. ইকবাল বাহার বলেন, বগুড়া শহরে ভয়ঙ্কর মাদক আইসের বিস্তার নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ চিন্তিত। ইয়াবার চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালি ক্ষতিকর এই মাদক। এর প্রধান ক্রেতা বিত্তবানের এক শ্রেণির বখে যাওয়া সন্তানরা। ইয়াবার চেয়ে এর দাম বহুগুণ বেশি। আগে ঢাকায় এই উচ্চমাত্রার মাদক নিয়ে কারবার হলেও বগুড়ায় স্মরণকালে এই প্রথম আইস নিয়ে ধরা পড়েছে আইয়ুব নামের এক কারবারি।

ক’দিন আগে ৩০ লাখ টাকার ৩০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ/আইস্ উদ্ধারসহ আইয়ুব আলীকে (৩৫) গ্রেফতার করে ডিবি। আইয়ুব কক্সবাজার থেকে আইস বহন করে বগুড়ায় আনে। শহরের জলেশ্বরীতলায় এক নারীকে সরবরাহের কথা ছিল আইসগুলো। কিন্তু ওই নারীর কাছে পৌঁছার আগেই গোপন সংবাদেরভিত্তিতে ডিবি তাকে ধরে ফেলে।

ধৃত আইয়ুব আলী কক্সবাজার জেলার চরকিয়া থানাধীন পূর্ব কৈয়ারবিল এলাকার আবুল কাশেমের ছেলে। বগুড়া কারাগারে রয়েছে সে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে মুখ খোলেনি। তার অন্য সহযোগী ও তার গডফাদারের বিষয়ে তেমন কোন তথ্য দেয়নি। শুধু বলেছে সে বাহক মাত্র। সে ওই নারীর কাছে আইস সরবরাহের জন কক্সবাজার থেকে বগুড়ায় এসেছিল। ওই নারীর খোঁজে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপপরিচালক মো. জিললুর রহমান বলেন, ইয়াবায় এমফিটামিন থাকে পাঁচভাগ আর ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের পুরোটাই এমফিটামিন। তাই এটি ইয়াবার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ক্ষতিকর মাদক। ইয়াবার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে মানবদেহে। ইয়াবা বা হেরোইন হলো ওপিয়ামের বাইপ্রডাক্ট। এগুলো থেকেই প্রসেস করে এখন নতুন নতুন মাদক তৈরি হচ্ছে। আইসও এমন একটি নতুন মাদক। এটা প্রধানত মায়ানমার থেকে চোরাপথে বাংলাদেশে ঢুকছে।

গবেষকরা বলছেন, এটা ইয়াবার মতোই সহজে বহনযোগ্য, তবে ইয়াবার চেয়ে বেশিগুণ ক্ষতিকর শরীরের জন্য। ক্রিস্টাল মেথ বা আইস সেবন করলে কারও স্ট্রোক হতে পারে। হার্টঅ্যাটাক হতে পারে। মানসিক অবসাদ বা বিষন্নতার কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। আরও অন্যান্য ঝুঁকি তো আছেই। নতুন এই মাদক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা জানান, মানবদেহে অতিঅল্প সময়ে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এই মাদক।

এই মাদক সেবনে মস্তিষ্কের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এ থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এই মাদক সেবনের ফলে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। আইসে শতভাগ এমফিটামিন থাকায় এটা বিশ্বজুড়েই ভয়ঙ্কর মাদক হিসেবে চিহ্নিত। ‘আইস’ লবণের মতো দানাদার জাতীয় মাদক। দেখতে কখনো চিনির মতো, কখনো মিছরির মতো। আইস উচ্চমাত্রার মাদক, যা সেবনের পর মানবদেহে দ্রুত উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এই মাদক সেবনে অনিদ্রা, অতিরিক্ত উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম ও হৃদরোগকে বেগবান করে।

এটি মূলত তিনভাবে সেবন করা যায়। প্রথমত, ধূমপান আকারে, কাচের পাইপের দ্বারা তৈরিকৃত বিশেষ পাত্রের মাধ্যমে, যাকে বলা হয় ‘বং’। দ্বিতীয়ত, ইনজেক্ট করে এবং তৃতীয়ত, ট্যাবলেট হিসেবে। এই মাদক অতিমূল্যবান। আসক্তদের কাছে চড়াদামে বিক্রি করা হয়। অতি বত্তশালীদের সন্তানরা এটি ব্যবহার করে থাকে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, আইস মাদকে ক্ষতিকর সবকিছুই আছে। নতুন এই মাদক তরুণ ও যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, সবাইকে নতুন মাদক ‘আইস’ নির্মূলে এগিয়ে আসতে হবে এবং সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/164901