সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে কিনতে হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার

সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে কিনতে হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার

হাফিজা বিনা : এক লাফে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়ানোর পরও সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৭শ’ ২৮ টাকায় গ্যাস পাচ্ছেন না ভোক্তারা। প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ১৯শ’ থেকে ১৯৫০ টাকায়।

গত মাসেও যেখানে ১৫শ’ থেকে ১৬’ টাকায় ১২ কেজির যে সিলিন্ডার মিলছিল সরকার দাম বাড়ানোর ফলে ভোক্তাকে অতিরিক্তি দামের সাথে আরও বেশি গুনতে হচ্ছে  ২শ’ থেকে আড়াইশো  টাকা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ২ এপ্রিল নতুন করে ১২ কেজি এলপিজির দাম ১,৩৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা ঐদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

বগুড়ার জলেশ্বরীতলা এলাকার বাসিন্দা মো: সালেক আহম্মেদের পরিবার রান্নার জন্য পুরোপরি এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তিনি জানান, এক লাফে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়ানোর পরও সরকার নির্ধারিত এ দরে গ্যাস পাচ্ছেন না তিনি। এমনিতেই সংসারের খরচ, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বাবা-মায়ের চিকিৎসা সব মিলিয়ে হিমশিম খাচ্ছি।

তাও যদি সরকারের বেধে দেয়া দামে গ্যাস পাওয়া যেত তবুও হতো। নির্ধারিত দামের চেয়ে আরও বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। তিনি  তার এলাকার একটি খুচরা দোকান থেকে বাসায় পৌছানো পর্যন্ত ২ হাজার টাকায় একটি সিলিন্ডার কিনেছেন গত সোমবার। এসব দেখার কেউ নেই। কোম্পানি- ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা নিজেদের মত করে দাম ঠিক করছেন।

একই কথা জানালেন বগুড়া শহরের চেলোপাড়া এলাকার সুপেন। তিনি বলেন, সরকার দাম বাড়ানোর পরও সেই দামে গ্যাস পাচ্ছি না। ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৯০০ থেকে ২০০০ হাজার টাকার নিচে মিলছে না। তাও আবার নিজের নির্ধারিত সিলিন্ডার নিয়েও আছে বেশ ঝামেলা।

এদিকে গত কয়েক মাস হলো সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দাম চড়তে থাকলে সরকার গত ডিসেম্বরে অভিযানে নামলে এলপিজি সিলিন্ডার বাজার থেকে হাওয়া হয়ে যায়, ধর্মঘটেও নামেন বিক্রেতারা। বাধ্য হয়ে অন্তর্বর্তী সরকার অভিযানে ক্ষান্ত দেয়। এ সুযোগে এলপিজির দাম দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়। তখন সংকটও তীব্র হয়। এরপর বাকিতে আমদানির সুযোগ, আমদানির কোটা বাড়ানোসহ সরকারের নানাবিধ প্রণোদনা প্রদান ও পদক্ষেপের পরও এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।

এরমধ্যেই জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বাড়ানো হয় দাম। বাসাবাড়ি ও দোকান-রেস্তোরাঁয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহও আবারও স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া বন্ধ হয়নি। এ নিয়ে একেবারে খুচরা বিক্রেতা, ডিলার ও কোম্পানিগুলোর একপক্ষ দায় চাপাচ্ছে আরেক পক্ষের উপর।

এ অবস্থায় ২ এপ্রিল একলাফে দাম বাড়ানো হয়েছে ৩৮৭ টাকা। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত দামে সরবরাহকারীদের থেকে গ্যাস পাচ্ছেন না। বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে বিধায় বাড়তি দামেই ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করছেন। বগুড়ার চেলোপাড়া এলাকার একজন খুচরা বিক্রেতা নাম প্রকাশ  না করা শর্তে জানান, তারা নিজের খরচ দিয়ে স্থানীয় ডিলারদের কাছ থেকে ফ্রেস, যমুনা, বসুন্ধরা বেক্সিমকো ইউনি গ্যাস নিয়ে আসছেন  ১৭৭০ থেকে  ১৯শ’ টাকায়।

সেখানে তারা বিক্রি করছেন ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ টাকা। কোন কোন ক্ষেত্রে পৌছানোর ভাড়া নেয়া হচ্ছে। একই কথা জানালেন  শহরের জামিলনগর এলাকার একজন খুচরা বিক্রেতা। তিনি জানান তিনি শুধুমাত্র উমেরা ও ওরিয়ন গ্যাস বিক্রি করছেন। তিনি ১২ কেজির ওরিয়ন সিলিন্ডার কিনছেন ১৮৩০ টাকা বিক্রি করছেন ১৯০০ টাকায়। উমেরা কিনছেন ১৮৮০ টাকায় বিক্রি করছেন ১৯৫০ টাকায়। বেশি দামের কথা বলতেই তিনি বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই দামে ডিলারদের কাছ থেকে আমরাই কিনতে পারি না। তাই আমরা যত টাকায় কিনবো একটু লাভ রেখে তেমনই তো বিক্রি করবো।                                                       
এব্যাপারে বগুড়া শহরের বারোপুর এলাকায় অবস্থিত বসুন্ধরা গ্যাসের ডিলার রুহুল আমিন রাজু বলেন, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস তারা এখনও পাচ্ছেন না। যোগাযোগ খরচসহ তাদের একটি ১২ কেজির সিলিন্ডারে খরচ হচ্ছে ১৭৪৩ টাকা। সেখান থেকে ৮০ থেকে ১০০ টাকা লাভ রেখে তারা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন ১৯শ’ টাকায়।

বগুড়া শহরের যমুনা নামাজগড় এলাকায় অবস্থিত যমুনা গ্যাসের ডিলার ছানোয়ার হোসেন জানান, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই গ্যাস কিনছেন। তার সাথে নিজেদের জন্য কিছু রেখে  ১৮শ‘ থেকে ১৮শ‘ ১০ টাকায় খুচরা বিক্রেতাদের গ্যাস সরবরাহ করছেন। খুচরা বিক্রেতারা তাদের খরচ রেখে কিছুটা বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রি করছেন।

এব্যাপারে ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতারা অভিযোগ করে বলেন, কোম্পানি থেকেই যদি সরকার নির্ধারিত দাম রাখা হয় তাহলে খুচরা পর্যায়ে লাভ এবং খরচ যোগ করে দামটা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এক্ষত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোম্পানি থেকে খুচরা পর্যন্ত সব পর্যায়ে সঠিকভাবে মনিটরিং করতে হবে, তাহলেই বাজারটা অস্থিতিশীল হবে বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেন।

উল্লেখ্য গত ২০২১ সালে আদালত বিইআরসিকে গণশুনানি করে এলপিজির দাম নির্ধারণের আদেশ দিয়েছিল। সেই থেকে প্রতি মাসে তারা ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রির জন্য সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দেন। তবে সেই দামে সাধারণত গ্যাস মেলেনা কখনই।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/164774