জয়পুরহাটের কালাইয়ে নষ্ট আলুর বিষক্রিয়ায় পঁচে গেছে বোরোর চারা : মাঠজুড়ে হাহাকার
কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি : আলু ওঠানোর সময় টানা চারদিনের বৃষ্টির পানি জমে মাঠেই তলিয়ে যায় আলু। ৬ বিঘা জমিতে বিভিন্নজাতের আলু রোপণ করেছিলাম। এক ছটাক আলুও পাইনি। গড়ে দুই লাখ টাকা লোকশান হয়েছে। সব আলু পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে জমিতেই। পঁচে যাওয়া আলু জমি থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে আবারও শ্রমিক খরচ হত।
টাকার অভাবে জমিতে আলু রেখেইে বোরোর চারা রোপণ করেছি। এক সপ্তাহের মধ্যে চারাগুলো পঁচে গেছে। ভেবে ছিলাম তাড়াহুড়া করে চারা রোপণ করায় হয়তো পঁচে গেছে। আবারও চারা রোপণ করলাম। সেগুলোও দেখছি পঁচে গেছে। অথচ আশপাশের জমিতে চারাগুলো সবুজ হয়েছে। এখন চারা পাবো কোথায়, আর রোপণ করবো কখন।
পঁচা আলুর বিষক্রিয়াই জমিতে বোরোর চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্গা নেওয়া জমিতে বোরোর চাষ করতে না পারলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে। এসব কথা বলছিলেন জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার মাত্রাই গ্রামের চাষী আনোয়ার হোসেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবার জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। এরমধ্যে জেলার কালাই উপজেলায় ১০ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আলু চাষাবাদ হয়েছে। অসময়ে টানা চারদিনের বৃষ্টির কারণে এ উপজেলার প্রায় ২ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমির আলু পানিতে তলিয়ে গিয়ে পঁচে যায়। ফলে এই উপজেলার প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন।
আলু ওঠানোর মৌসুমে হঠাৎ করে জমিতে বৃষ্টির পানি জমে আলু পঁচে যায়। ফলে জমিতে অতিরিক্ত গ্যাস হয়। সেই সাথে পঁচে যাওয়া আলুর বিষক্রিয়া মাটিতে পচনজনিত রোগবালাই জন্ম নেয়। এ কারণে রোপণকৃত বোরো ধানের চারা পঁচন রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্যাপক হারে নষ্ট হচ্ছে।
এতে নতুন চারা রোপণের বাড়তি খরচ ও ফসলের ক্ষতির শঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। তারা বলেন, সবকিছু প্রস্তুত, শুধুমাত্র হিমাগারে নেওয়ার অপেক্ষা, তা আর হয়নি। চোখের সামনে পরিপক্ব আলু তুলতে না পারার শোক কাটতে না কাটতেই যোগ হয়েছে নতুন করে সংকট। আলুর জমিতে এবার নষ্ট হচ্ছে বোরো রোপণের চারা। আসলে বেঁচে থাকার আর ইচ্ছে হয় না।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে বিভিন্ন মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের মাত্রাই, উদয়পুর ইউনিয়নের মোসলেমগঞ্জ, উদয়পুর, কালাই পৌরশহরের আওড়াঁ, ধাপপারা, পুনট ইউনিয়নের চাকলমওয়া, আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হাতিয়র মাঠে যারা পঁচা আলু জমিতে রেখেই বোরোর চারা রোপণ করেছে তাদের সবারই কমবেশী চারা পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে।
অনেকের আংশিক, আবার কারও পুরো জমির চারা নষ্ট হয়েছে। এসব জমিতে দুইবার চারা রোপণ করেও ফসল টিকাতে পারছেন না চাষীরা। এখনও জমিগুলো থেকে গ্যাস বুঁদ বুঁদ করে উঠতে দেখা গেছে। পঁচা আলুর বিষক্রিয়ায়ই মুলত নষ্ট হয়ে গেছে বোরোর চারা।
মাঠের মধ্যে কথা হয় চাষীদের সাথে। তারা বলছেন, বিশেষ করে হাইব্রিড জাতের চারা পঁচে গেছে। দ্বিতীয় ধাপে যারা জাত বদলিয়ে চারা রোপণ করেছে, তাদের জমিতে চারাগুলো প্রথমে হলুদ হলেও, পরে সবুজ হয়ে গেছে। প্রথম ধাপে সবারই চারা পঁচে গেছে। পরে অনেকেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে চারার রোপণ করছেন। চারা না পেয়ে অনেকেই বোরোর আশা ছেড়ে দিয়েছেন। আবার অনেকেই নতুন করে বীজ তলা প্রস্তুত করেছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হারুনুর রশিদ বলেন,‘বৃষ্টির পানিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এটা লুকানোর কিছু নেই। তবে এটা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। এসব জমিতে বোরোর চারা রোপণ করতে হবে। এ অবস্থায় বোরো রোপণ করলে জমিতে গ্যাস তৈরি হবে, ফসফটিক পরিবেশ বেড়ে যাবে। এসিটিক কনডিশন তৈরি হবে, যাতে পরবর্তী ফসলের জন্য ক্ষতিকর।
পঁচা আলুসহ জমি চাষ করতে হলে কমপক্ষে ৭-১০ দিন পর বোরোর চারা রোপণ করতে হবে। তা না হলে ব্যাপক ক্ষতি হবে। তার চেয়ে পঁচে যাওয়া আলু সরিয়ে বোরো চারা রোপণ করাই উত্তম। তিনি আরও জানান, তড়িঘড়ি করে পঁচা আলুসহ বোরোর চারা যারা রোপণ করেছে, তাদেরই চারা পঁচে গেছে। চাষীদের বারবার সতর্ক করার পরও তারা এমন ভুল করছেন।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/164570