প্রযুক্তি ও দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষা সময়ের দাবি
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ও দক্ষতার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও সেই পুরোনো একাডেমিক শিক্ষাতেই আটকে রয়েছে। বিশ্বে একাডেমিক শিক্ষার মূল্য তখনই মেলে, যখন তা প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক হয়। বলাই বাহুল্য, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তি জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগের এখনও বড় অভাব। ফলে শিক্ষিত তরুণ তরুণীরা চাকরির বাজারে, দেশকে এগিয়ে নেয়ার কর্মকান্ডে পিছিয়ে পড়ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা গ্রাজুয়েশন শেষ করে সম্মানজনক চাকরির জন্য আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকা এবং শিক্ষার সাথে প্রযুক্তিজ্ঞান ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের সংযোগ না থাকায় সেই পড়াশোনাও কাঙ্খিত কর্ম প্রাপ্তিতে অনেক সময়ই তেমন কাজে আসে না। এটি তারুণ্যের মনোবলে যেমন হতাশার ছায়া ফেলছে, তেমনি অপচয় ঘটছে সময়, অর্থ ও শ্রমেরও। বিশ্ব যেখানে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন রোবেটিক্স, বিগ ডাটা, ডিজিটাল প্লাটফরম ইত্যাদি কর্মক্ষেত্রের চেহারা আমূল পাল্টে দিচ্ছে, সেখানে কেবল মুখস্থনির্ভর বা সার্টিফিকেট কেন্দ্রিক শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া দূরের কথা, টিকে থাকাই প্রায় অসম্ভব। এখনকার বাস্তবতায় শিক্ষাকে হতে হবে মানবিক মূল্যবোধ, আধুনিক প্রযুক্তি ও বাস্তবমুখী দক্ষতার সমন্বিত রূপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের শিক্ষা অর্জন করলে শিক্ষার্থী কেবল চাকরিপ্রার্থী নয়, সৃজনশীল উদ্ভাবক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পাবে। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমের সঙ্গে বাস্তব জীবনের চাহিদার অসামঞ্জস্য, প্রযুক্তির অপরিকল্পিত ব্যবহার, উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রতি মনোযোগের যথেষ্ট অভাব বিদ্যমান। দেশকে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিতে হলে এ অবস্থাকে জিইয়ে রাখার কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যূরো-বিবিএস’এর সর্বশেষ জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮ লাখ তথা মোট বেকারের ৩১.৪৯ শতাংশ। প্রতি বছর প্রায় ১৮-২০ লাখ নতুন চাকরিপ্রত্যাশী জবমার্কেটে প্রবেশ করছে কিন্তু দেশে বিদেশে মিলিয়ে মাত্র ৫-৬ লাখের কর্ম সংস্থান হয়; বাকি শিক্ষিতরা থেকে যায় বেকার। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সােেয়ন্স বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম একটি সংবাদপত্রকে জানান, আমরা যত সংখ্যক গ্রাজুয়েট তৈরি করছি , ততসংখ্যক জব তৈরি করতে পারছি না। এ ধরনের জবের জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার, সেটিও পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া চাকরি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যে দক্ষ গ্রাজুয়েট তৈরি করার কথা,সেটা আমরা করতে পারছি না। ফলে দেশ-বিদেশে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না অনেক শিক্ষিত তরুণরা। শিক্ষিত বেকারের এই ক্রমবর্ধমানতা একটি উন্নয়নশীল জাতি হিসেবে আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। তাই যুগের চাহিদা মেটাতে প্রায় অক্ষম এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে কর্মমুখী করে তোলার কোন বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ও দক্ষতা বৃদ্ধিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। যদি প্রযুক্তির কথা ধরা হয়, তাহলে দেখা যাবে-আমাদের দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে শিক্ষিত তারুণ্যকে কাজে লাগাতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষতাকে পাশাপশি রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। কেননা, প্রযুক্তি ও দক্ষতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি ও প্রত্যাশিত সমৃদ্ধি। এই বাস্তবসম্মত উপলদ্ধির প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই বর্তমান সরকারের ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্রীয় সংস্কার রূপরেখার মধ্যে। এর শিক্ষা সংক্রান্ত অন্যতম প্রধান দফায় বলা হয়েছে-শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু স্মার্ট বোর্ড বা কম্পিউটার সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিক্ষণ পদ্ধতি,মূল্যায়ন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। ডিজিটাল লার্নিং প্লাটফরম, ভাচর্ৃুয়াল ল্যাব, অনলাইন রিসোর্স ইত্যাদি শিক্ষার গুণমান বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল লিটারেসি, ডেটা ব্যবহারের নৈতিকতা ও সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। ৩১ দফায় আইটি স্কিল, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর সাথে শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম গঠনের উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠারও সুযোগ পাবে। এই প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ শুধু প্রতিযোগিতায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতেই নয়, অর্জিত প্রযুক্তিজ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রাখতে পারবে। মূলত শিক্ষাকে হতে হবে এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থী কেবল প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহারকারী নয়, একইসাথে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠারও যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে। সন্দেহ নেই, বিএনপির এই শিক্ষা বিষয়ক রূপরেখাটি প্রচলিত ডিগ্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মমুখী করে তোলার একটি দৃঢ় প্রত্যয়। এই লক্ষ্য অর্জন করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার। এর সাথে পর্যাপ্ত আর্থিক বিনিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা সংস্কার বিষয়ে গবেষণা করার মতো শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ টিম এবং প্রস্তাবিত রূপরেখা বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ যুক্ত হলে একটি প্রযুক্তিজ্ঞানভিত্তিক দক্ষ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব কিছু নয়।
লেখকঃ
রাহমান ওয়াহিদ
কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/164484