কিশোর গ্যাং: একটি জাতির ভবিষ্যৎ সংকট
একটা সময় কিশোর মানেই ছিল স্বপ্নের আরেক নাম পরিবারের আশ্রয়, সমাজের সম্ভাবনা, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। আজ সেই জায়গাতেই ধীরে ধীরে জমে উঠছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা।বাংলাদেশের রাস্তায় এখন কিশোররা শুধু পথচারী নয় অনেক ক্ষেত্রে তারা হয়ে উঠছে ভয়ের প্রতীক খবরের পাতা খুললেই দেখা যায় কোথাও কিশোরদের হাতে খুন, কোথাও ইভটিজিং, কোথাও চাঁদাবাজি, কোথাও আবার মাদক বা দখল বাণিজ্যে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। প্রশ্নটা তাই ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে, এই কিশোররা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? শুধু ঢাকাতেই বর্তমানে ৫০টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে শত শত সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। গবেষণা বলছে, কিশোর অপরাধীদের ৭২% চুরি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধে এবং ৫৬% নেশা ও ভাঙচুরে জড়িত। এমনকি নারী নির্যাতন সংক্রান্ত অভিযোগেও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে সম্প্রতি দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে ৫০-এর বেশি কিশোর অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে, যা এই সমস্যার ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। কিশোর গ্যাং কোনো হঠাৎ জন্ম নেওয়া সমস্যা নয়। গত দুই দশকের দ্রুত নগরায়ণ, প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন সব মিলিয়ে কিশোরদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ বদলে গেছে। আগে যেখানে পরিবার, পাড়া ও আত্মীয়-স্বজন মিলে একটি সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করত, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে বিচ্ছিন্নতা, ব্যস্ততা এবং মানসিক দূরত্ব। সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে গ্যাং যেখানে একজন কিশোর খুঁজে পায় পরিচয়, গ্রহণযোগ্যতা এবং এক ধরনের “ক্ষমতার অনুভূতি”। এই গ্যাংগুলো এখন আর কেবল বন্ধুমহল নয়; তারা একটি “অপরাধ অর্থনীতি”-র অংশ হয়ে উঠছে। ইভটিজিংয়ের মাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা কে হুমকিতে ফেলা, চাঁদাবাজির মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে ভীতির পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করা, মাদকের বিস্তারের মাধ্যমে একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া, দখল বাণিজ্যের মাধ্যমে আইনের শাসনকে দুর্বল করা, টেন্ডারবাজির মাধ্যমে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সবখানেই কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা অনেক ক্ষেত্রে আড়ালে থাকা বড় অপরাধচক্রের ‘ফ্রন্টলাইন সৈনিক’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কিন্তু এই দৃশ্যমান অপরাধের চেয়েও ভয়ংকর হলো অদৃশ্য ক্ষত। ধীরে ধীরে সমাজে একটি বিপজ্জনক ধারণা তৈরি হচ্ছে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়, এবং তা দিয়ে দ্রুত অর্থ ও প্রভাব অর্জন করা যায়। যখন একটি কিশোর এই বার্তাটি গ্রহণ করে, তখন তার কাছে বই-খাতা বা পরিশ্রম মূল্যহীন হয়ে যায়। অপরাধ হয়ে ওঠে ধনী হওয়ার শর্টকাট পথ। এভাবেই অপরাধ “স্বাভাবিক” হয়ে ওঠে’’ এটাই একটি জাতির নৈতিক ভিত্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে পরিবারে। একজন কিশোর যখন গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ে, তখন সে শুধু নিজেকে হারায় না, তার পরিবারকেও ভেঙে দেয়। বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে, বিশ্বাস নষ্ট হয়, ঘরের ভেতরে নেমে আসে ভয়, অশান্তি ও অস্থিরতা। অনেক পরিবার আইনি ঝামেলা, সামাজিক লজ্জা ও আর্থিক চাপে ভেঙে পড়ে। পরিবারের অন্য সদস্যদের ভবিষ্যৎ হয়ে যায় অনিশ্চিত। এই ভাঙন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। একটি সূখী পরিবারের উন্নয়নের স্বপ্ন থমকে যেতে যেতে হারিয়ে যায় সময়ের গর্ভে, রয়ে যায় লোক মুখে তাদের করুণ পরিনতির গল্প।
সমাজের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি। যেখানে কিশোর গ্যাং সক্রিয়, সেখানে নিরাপত্তাহীনতা স্থায়ী রূপ নেয়। নারীদের চলাচল সীমিত হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ নষ্ট হয়, ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে থাকে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সামাজিক আস্থার। মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয় পায়। ধীরে ধীরে একটি নীরব সংস্কৃতি গড়ে ওঠে “চুপ থাকাই নিরাপদ”। এই নীরবতা সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
রাষ্ট্রের ওপর এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। যখন কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধচক্র তাদের স্বার্থ হাসিল করে, তখন আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায়। একই সঙ্গে গড়ে ওঠে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি, মাদক, চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্যকেন্দ্রিক, যা রাষ্ট্রের বৈধ অর্থনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে, ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিনিয়োগ কমে, উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আর সবচেয়ে বড় ক্ষতি মানবসম্পদের অপচয়। যে কিশোর একদিন দেশের সম্পদ হতে পারত, সে পরিণত হচ্ছে অপরাধের যন্ত্রে রাষ্ট্রের বোঝা। এভাবে একটি ভয়ংকর চক্র তৈরি হয়। পরিবারের ভাঙন কিশোরকে গ্যাংয়ের দিকে ঠেলে দেয়, গ্যাং সমাজকে দুর্বল করে, দুর্বল সমাজ রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, আর দুর্বল রাষ্ট্র আবার নতুন করে এই সমস্যার জন্ম দেয়। এই চক্র যতদিন চলবে, ততদিন সমস্যা আরও গভীর হবে।
সমাধান তাই বহুমাত্রিক হতে হবে। পরিবারকে সন্তানের সঙ্গে সময় ও মানসিক সংযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিকতা ও জীবনদক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। সমাজকে এমন সুযোগ তৈরি করতে হবে, যেখানে কিশোররা খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও ইতিবাচক কাজে যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং কিশোরদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন।
শেষ পর্যন্ত একটি সত্য স্পষ্ট কিশোরদের হারানো মানে ভবিষ্যৎ হারানো। তাই এখনই সময় এই নীরব আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর। কারণ, একটি জাতির শক্তি তার তরুণ প্রজন্মের মধ্যেই নিহিত আর সেই শক্তি যদি ভুল পথে পরিচালিত হয়, তবে ভবিষ্যৎও অন্ধকার হয়ে পড়ে। কারণ, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার কিশোরদের হাতেই গড়ে ওঠে আর সেই হাত যদি ভুল পথে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎও পথ হারায়।
লেখক :
ফারুক আহমেদ জুবলু
সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/164319