বৈশাখকে বরণ করে নিতে বর্ণিল সাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা

বৈশাখকে বরণ করে নিতে বর্ণিল সাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা

ঢাবি প্রতিনিধিঃ চৈত্রের প্রখর দুপুরেও থেমে নেই ব্যস্ততা। রঙ, তুলির আঁচড় আর সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে মুখর হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রাঙ্গণ। কেউ মাটির সরায় আলপনা আঁকছেন, কেউবা লাল, সাদা, হলুদ আর নীল রঙে ফুটিয়ে তুলছেন গ্রামবাংলার চিরচেনা দৃশ্য—ধানক্ষেত, নদী, নৌকা আর সময়ের বিমূর্ত গল্প। এই ব্যস্ততার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—আসন্ন পহেলা বৈশাখ। আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই বাংলা নববর্ষ, যার সূচনা হবে চারুকলার ঐতিহ্যবাহী বর্ণিল শোভাযাত্রার মাধ্যমে।

এবারের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। সেই আয়োজনকে সফল করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দিন-রাত এক করে কাজ করছেন। চারুকলার ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি রঙিন সরা। একটু এগোলেই দেখা যায় ছোট ছোট জলরঙের চিত্রকর্ম, যেখানে গ্রামবাংলার শান্ত, স্নিগ্ধ প্রকৃতি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। জয়নুল গ্যালারির ভেতরে যেন আরেক জগৎ—সেখানে তৈরি হচ্ছে নানা রকম মুখোশ। বাঘ, রাজা, প্যাঁচা কিংবা কল্পনার অদ্ভুত সব চরিত্র রঙ ও রেখায় পাচ্ছে নতুন প্রাণ।

প্রাঙ্গণের খোলা আকাশের নিচে ত্রিপলের আড়ালে তৈরি হচ্ছে বিশাল কাঠামো—মোরগ, হাতি, পায়রা। বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর ওপর ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এসব প্রতীকী অবয়ব। কোথাও শিক্ষক দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, আবার কোথাও শিক্ষার্থীরাই খুঁজে নিচ্ছেন নতুন শিল্পভাষা। সম্মিলিত এই প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে উৎসবের রূপকল্প। পুরো পরিবেশে যেন এক অদৃশ্য ছন্দ কাজ করছে। কোথাও ভেসে আসছে বাংলা গানের সুর, কোথাও ছড়িয়ে পড়ছে হাসির রেশ। নবীন শিক্ষার্থী পলক হালদার ব্যস্ত কাগজে নকশা আঁকতে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের পড়াশোনা গৎবাঁধা নয়, তাই ক্লান্তিও আসে না। তবে এই শোভাযাত্রার প্রস্তুতি একেবারেই আলাদা—মনে হয়, নিজের হাতেই বছরের প্রথম সকাল সাজিয়ে তুলছি।”

শুধু শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নন, সাধারণ মানুষেরও ভিড় বাড়ছে চারুকলায়। গৃহিণী মারুফা হাসান মেয়েকে নিয়ে এসেছেন এই সৃজনশীল আয়োজন দেখতে। তাঁর মতে, “এত নির্মল আনন্দ আর কোথাও পাওয়া যায় না।” এবারের শোভাযাত্রার মোটিফ নিয়েও রয়েছে বিশেষ ভাবনা।

চারুকলা অনুষদের ডিন শেখ আজহারুল ইসলাম চঞ্চল জানান, প্রতিটি উপাদানেই রয়েছে গভীর প্রতীকী অর্থ। প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকছে বিশালাকৃতির মোরগের প্রতিকৃতি—যা ভোরের আলো, নতুন সূচনা ও জাগরণের প্রতীক। কৃষিনির্ভর বাংলার জীবনযাত্রায় মোরগের ডাক যে সময়চিহ্ন বহন করে, সেটিই এখানে নতুনভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে।

এছাড়াও বাউল শিল্পীদের সাম্প্রতিক অবমূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে সংগীতের প্রতীক হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে দোতারা। শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা দিতে থাকছে পায়রার মোটিফ। একই সঙ্গে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির টেপা ঘোড়াও এবারের শোভাযাত্রায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, চারুকলা প্রাঙ্গণ এখন যেন এক জীবন্ত শিল্পমেলা—যেখানে সৃজনশীলতা, ঐতিহ্য আর সমকালীন বার্তা একসূত্রে গাঁথা হয়ে বরণ করে নিতে প্রস্তুত নতুন বছর।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/164217