কৃষক কার্ডে দশ ধরনের সুবিধা পাবেন কৃষক

কৃষক কার্ডে দশ ধরনের সুবিধা পাবেন কৃষক

আজকের কৃষি উন্নয়নের যে নানা সূচকের উন্নতি হচ্ছে তার ভিত্তি মূলত ৭০-এর দশকেই রচিত। সব মিলিয়ে কৃষিতে আজ আট কোটি টন শস্য উৎপাদন হচ্ছে, স্বাধীনতার পরে ছিল এক কোটি টনের নিচে। সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষিতে গ্রামীণ উন্নয়ন আর আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু। মানসম্মত বীজ, সারের কারখানা প্রতিষ্ঠা, সেচ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুকরণ, বালাইনাশক কারখানা তৈরি, জমির ক্ষয় রোধ, বন্যা থেকে রোধে বাঁধ নির্মাণ, কৃষির আধুনিক যান্ত্রিকীকরণ, সমন্বিত কৃষি বাস্তবায়ন, জমির প্রকৃতি বুঝে ফসল ফলানো, সময়মতো ফসল উৎপাদন, জরিপ করে পরিকল্পনা গ্রহণ, রবি মৌসুমে বেশি করে ফসল ফলানোর তাগিদ, শহর ছেড়ে গ্রামমুখী হওয়া, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলাসহ কৃষি উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির অগণিত কার্যক্রম। দেশের মানুষের ভাতের চাহিদা মেটাতে সবচেয়ে বড় অবদান ব্রি ,বারি, হর্টিকালচার বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, সিড সার্টিফিকেশন এজেন্সি, রাবার উন্নয়ন কার্যক্রম, বিএডিসি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ গবেষণা সমন্বয়ের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)। ১৯৮২ সালে ফসল প্রযুক্তি সম্প্রসারণে নিয়োজিত  ছয়টি সংস্থাকে একত্রিত করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সৃষ্টি করা হয়, ফসলের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষিজ পণ্যের সহজলভ্যতা ও সরবরাহ বৃদ্ধি, কৃষি ভূ-সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও সংরক্ষণ, কর্মব্যবস্থাপনায়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসারে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের (বিশেষ করে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা ঝঅঅঙ) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মূলত গবেষণাগারের নতুন প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেন এবং কৃষকের সমস্যা সমাধানের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেন। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত নতুন জাতের বীজ, সার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম, এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের শিক্ষিত ও সচেতন করা, পোকা-মাকড় দমনে কৃষকদের সরাসরি কারিগরি পরামর্শ দেওয়া, কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখানোর জন্য ‘প্রদর্শনীর মাঠ’ (উবসড়হংঃৎধঃরড়হ চষড়ঃ) স্থাপন করা। টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন বা গ্রুপ তৈরির মাধ্যমে দলগতভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করা। কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য প্রদান করা এবং মাঠ পর্যায়ে ই-কৃষির ব্যবহার জনপ্রিয় করা। বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষ এবং পুষ্টি নিশ্চিতকরণে পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া। সম্প্রসারণ কর্মীরা কৃষি গবেষণার ফলকে মাঠে বাস্তবে রূপান্তরকারী, যারা আধুনিক, নিরাপদ এবং লাভজনক কৃষির অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করেন। জুলাই-২০২৪ পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ সরকার কৃষকদের বিশেষ সুবিধা প্রদান, সহজলভ্য ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে ‘কৃষক কার্ড’ (কৎরংযধশ ঈধৎফ) চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড বা স্মার্ট কার্ডের আদলে একটি ডিজিটাল আইডি কার্ড হিসেবে কাজ করবে। কৃষি খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি, ঋণ ও প্রণোদনার মতো সুবিধা কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে কৃষকদের কার্ডের আওতায় আনা। আগামী ৪ বছরে ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কৃষক কার্ড বিতরণ করবে সরকার। মৎস্যচাষি ও দুগ্ধখামারিরাও এ কার্ডের সুবিধা পাবেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ কার্ডের আওতায় একজন কৃষক প্রাথমিকভাবে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। সুবিধার মধ্যে থাকছে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি, সরকারি প্রণোদনা, ন্যায্যমূল্যে সেচসুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বিমাসুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার তথ্য ও রোগবালাই দমনে পরামর্শ। এ কার্ডের আওতায় জমির পরিমাণ অনুযায়ী কৃষক সার কিনতে পারবেন। এতে কৃষিজমিতে অতিরিক্ত সারের ব্যবহার বন্ধ হবে বলে আশা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। কৃষকের অন্যান্য ভাতা প্রাপ্তির কোনো কার্ড থাকলে সেটা এ কার্ডের অধীনে চলে আসবে। এ জন্যে সোনালী ব্যাংকে প্রত্যেক কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট থাকবে। প্রথম ধাপে ২১ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ৫ শতাংশের কম জমির মালিক হলে ভূমিহীন, ৫ থেকে ৪৯ শতাংশের মালিক হলে প্রান্তিক ও ৫০ থেকে ২৪৯ শতাংশ জমির মালিক হলে তাকে ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কার্ডে কৃষকের ৪৫ ধরনের তথ্য থাকবে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষক কার্ড দেওয়ার অংশ হিসেবে দেশের  ১০টি উপজেলার ১০টি কৃষি ব্লকে পরীক্ষামূলকভাবে তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহের কাজ শেষ। এরপর ১৫টি উপজেলার সব কৃষককে নিয়ে কৃষক কার্ডের বিষয়টি পরীক্ষা–নিরীক্ষা হবে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরকার কৃষি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, কৃষকের সামগ্রিক আয় বৃদ্ধি, প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা, কৃষকের চাষাবাদের খরচ কমানো, কৃষি পণ্যের বিপণন প্রক্রিয়া উন্নত করা ও সব ধরনের ভর্তুকি (আর্থিক ও কৃষি উপকরণ) বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। কৃষকদের জন্য নির্ভুল ও ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করা, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু করা এবং সার-ডিজেল ও অন্যান্য ভর্তুকি বিতরণে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সর্বোপরি কৃষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং বিশেষ করে বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলী ইউনিয়নকে প্রথম ধাপেই পাইলটিং প্রকল্পের আওতায় আনয়নের বিষয়টি বগুড়াবাসীর জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। কৃষক কার্ড কার্যক্রমের সফল সমাপ্তি প্রত্যাশা করছি। (সংগৃহীত তথ্য) 

লেখক: 
ফরিদুর রহমান এম এ
সাধারণ সম্পাদক, ডিকেআইবি, 
বগুড়া জেলা

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/163836