ঢাবির টিএসসি পরিণত হয়েছে ভয়ের কেন্দ্রে
ঢাবি প্রতিনিধি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র টিএসসি—যেখানে একসময় প্রাণবন্ত আড্ডা, গান আর নিশ্চিন্ত চলাচলের পরিবেশ ছিল—সেই স্থানই এখন শিক্ষার্থীদের কাছে ধীরে ধীরে আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর টিএসসি ও আশপাশের এলাকাগুলো যেন ভিন্ন এক বাস্তবতায় রূপ নেয়, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
বর্তমানে টিএসসি এলাকাজুড়ে তীব্র যানজট, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। মেট্রোরেলের বিশাল অবকাঠামোর নিচে দিনের বেলাতেই আলো কম পৌঁছায়, আর সন্ধ্যার পর নষ্ট ল্যাম্পপোস্টের কারণে পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। এই অন্ধকার এবং যানজট মিলেই তৈরি করছে এক অরক্ষিত পরিবেশ।
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে কবি সুফিয়া কামাল হল পর্যন্ত প্রায় ১.৩ কিলোমিটার পথটি এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাধারণ সময়ে যেখানে হেঁটে যেতে ১৫ মিনিটের বেশি লাগে না, সেখানে এখন যানজটে আটকে থেকে দীর্ঘ সময় পার করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এই সুযোগে আশপাশে অবস্থান নেওয়া মাদকাসক্ত ও অসামাজিক ব্যক্তিরা এগিয়ে এসে হয়রানির চেষ্টা চালায়—এমন অভিযোগও উঠেছে।
টিএসসি মেট্রো স্টেশনের আন্ডারপাস, রমনা কালী মন্দির সংলগ্ন এলাকা, তিন নেতার মাজার এবং ঢাকা গেট—এই পুরো অঞ্চলটি ধীরে ধীরে মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ফুটপাথ ও ডিভাইডার দখল করে বসবাস করছে ভাসমান মানুষ। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাদকের উচ্ছিষ্ট, ফেনসিডিলের বোতল এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পুরো এলাকাটিকে আরও অনিরাপদ করে তুলেছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন নারী শিক্ষার্থীরা। কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) সানজানা চৌধুরী রাত্রি বলেন, “মাদকাসক্ত এবং ভবঘুরেদের কারণে আমাদের হলের ছাত্রীরা এই রুট ব্যবহার করতে ভয় পায়। সন্ধ্যার পর রাস্তাটি এতটাই অরক্ষিত হয়ে পড়ে যে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। যানজট পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে। যখন গাড়িগুলো আটকে থাকে, তখন চাইলেও দ্রুত সরে যাওয়া যায় না—বিপদের মুখে অসহায় হয়ে বসে থাকতে হয়।”
তিনি আরও জানান, হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। হলের ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থাও সীমিত, ফলে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে তাদের।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাও এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী নাবিলা ঐশী জানান, “রাতে ভিসির বাসভবনের কাছাকাছি এলাকায় হঠাৎ এক অজ্ঞাত ব্যক্তি আমার দিকে একটি খাম হাতে নিয়ে তেড়ে আসে। আমি ভয় পেয়ে দৌড়ে সেখান থেকে সরে যাই। ঘটনাটি আমাকে ভীষণ আতঙ্কিত করেছে।”
এদিকে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এলাকাটি এখন অনেকটাই বাজারের মতো বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে। আগে আমরা বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতাম, কিন্তু এখন সেই ব্যবস্থা আর নেই। তীব্র যানজটের কারণে শুধু ছাত্রীরা নয়, যে কেউ এখানে হয়রানির শিকার হতে পারে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।”
শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, বহিরাগতদের প্রবেশ সীমিতকরণ এবং নিয়মিত নিরাপত্তা টহল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র তার স্বাভাবিক পরিবেশ হারিয়ে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/163731