নেপাল : দলমুক্ত শিক্ষাঙ্গন থেকে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের পথে
নেপালের নবগঠিত সরকারের শিক্ষা খাতে সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এক সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শিক্ষাব্যবস্থায় যে ব্যাপক পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন, তা কেবল নীতিগত সংস্কার নয় বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের রূপরেখা। ১০০ দফার এই সংস্কার কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, গবেষণামুখী এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তোলা। এই সংস্কারের অন্যতম আলোচিত দিক হলো স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দল-অনুমোদিত সব ধরনের ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত। দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে শিক্ষাঙ্গন দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের শিকার। ফলে শিক্ষার পরিবেশ বারবার ব্যাহত হয়েছে, সেশনজট বেড়েছে, সহিংসতা ও বিভাজন শিক্ষার্থীদের মানসিক ও একাডেমিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নেপাল এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে। রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের পরিবর্তে ‘স্টুডেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশের একটি বিকল্প, সুস্থ ও অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে। এটি শিক্ষাঙ্গনকে আরও স্থিতিশীল ও জ্ঞানচর্চার উপযোগী করে তুলবে।
একইসঙ্গে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রথাগত পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্তটি শিক্ষার দর্শনে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অঞ্চলে পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে এসেছে। শিশুদের শেখার আনন্দ, সৃজনশীলতা ও কৌতূহল অনেকাংশেই এই চাপের নিচে চাপা পড়ে যায়। নেপাল সেই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে বিকল্প ও মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শেখা তখন আর শুধুই নম্বরের প্রতিযোগিতা থাকবে না; বরং হয়ে উঠবে একটি আনন্দময় ও অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সেশনজট নিরসনে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষার ফল প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা অনেক দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে পিছিয়ে দিয়েছে। সময়মতো ফল প্রকাশ ও একাডেমিক ক্যালেন্ডার মেনে চলা শিক্ষার্থীদের জীবনে স্থিতিশীলতা আনবে এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
সরকার শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, বরং পুরো জনসেবা কাঠামোতেই দলীয় প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং কর্মচারীদের জন্য দলীয় আনুগত্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়, তখন সেবার মান এবং দক্ষতা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। এই সব উদ্যোগের সম্মিলিত প্রভাব নেপালকে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়নের জন্য জ্ঞান, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনই সবচেয়ে বড় সম্পদ। একটি মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে, যারা নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে পারে, প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখতে পারে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম হয়। নেপালের এই সংস্কার সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করছে। এটি অর্থনীতিকে বহুমুখী ও টেকসই করে তুলবে।
আন্তর্জাতিকীকরণের দিক থেকেও এই উদ্যোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল, গবেষণামুখী এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিদেশি শিক্ষার্থী ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব, গবেষণা সহযোগিতা এবং একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য এটি একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে। ফলে নেপাল ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক শিক্ষা হাবে পরিণত হতে পারে। নেপাল খুব শিগগিরই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতির উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর জন্য এটি একটি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে, যেখানে সাহসী সিদ্ধান্তই পারে একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে।
লেখকঃ
প্রফেসর ড. সামিউল তুষার
প্রক্টর, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি), সিলেট।
সেমিনার বিষয়ক সহ-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ইউট্যাব)
কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি।
সাধারণ সম্পাদক, ইউট্যাব সিকৃবি ইউনিট।
আজীবন সদস্য, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন।