লালমনিরহাটে বেড়েছে তামাক চাষ, হুমকির মুখে পড়েছে মাছসহ নানা জলজ প্রাণির প্রজনন
বেলাল হোসেন, লালমনিরহাট : এই শুস্ক মৌসুমে লালমনিরহাটের তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চলগুলোতে বেড়েছে নদী ও মাছের ক্ষতিকারক তামাক চাষ। লাভজনক হওয়ায় কৃষকের তামাক চাষে আগ্রহ বাড়লেও এই তামাক চাষে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নদীর পানি দূষিত করছে। এর ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে নানা প্রজাতির মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণির প্রজনন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। এদিকে তিস্তার চরাঞ্চলে ঠিক কী পরিমাণ জমিতে এই তামাক চাষ হচ্ছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই কৃষি বিভাগের কাছে। একই সঙ্গে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে নেয়া হচ্ছে না কোন কার্যকর উদ্যোগেও।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বুকে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ নানা ফসল আবাদ সম্ভব হলেও বেশি মুনাফার কারণে অধিকাংশ জমিই এখন তামাকের। এসব কৃষকেরা জানান, গত দুই দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর প্ররোচনা, সহজ ঋণ ও আগাম চুক্তিভিত্তিক কেনাবেচার কারণে এই প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। তামাক চাষে অন্যান্য ফসলের তুলনায় ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।
চরাঞ্চলের এক কৃষক জানান, প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি প্রতি মৌসুমে ১২ থেকে ১৫ বিঘা জমিতে তামাক চাষ করছেন। পাশাপাশি অন্য ফসলও করেন, কিন্তু লাভ কম। তামাকেই আয় বেশি হয়। ওই কৃষক আরও বলেন, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি কম থাকে, মাছও কম থাকে। তাই তামাক চাষে পানি দূষণের কারণে মাছ কমছে এটা পুরোপুরি ঠিক নয়। একই ধরনের মত দিয়েছেন লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার চর গোবর্ধান এলাকার কৃষক ফজলু মিয়া। তিনি বলেন, আগে আমরা গম, কাউন, পেঁয়াজ-রসুন চাষ করতাম। এখন সবাই তামাক চাষ করছি। কারণ এতে খরচ কম, লাভ বেশি। তবে তিনি স্বীকার করেন, রাসায়নিকের কারণে কিছুটা পানি দূষণ হয়। কিন্তু এতে মাছের প্রজনন পুরোপুরি বন্ধ হয় এটা তিনি মানতে নারাজ। কৃষকদের এই দাবির সঙ্গে একমত নন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা। জেলেদের দাবি নদীরবুকে তামাক চাষ মাছ প্রজনন ঘটাতে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটি এলাকার জেলে লক্ষণ চন্দ্র দাস বলেন, তামাক চাষ শুরু হওয়ার আগে তিস্তায় অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন নদী প্রায় ফাঁকা। শুষ্ক মৌসুমে তো পানি থাকে না, বর্ষাতেও আগের মতো মাছ নেই। তিনি অভিযোগ করেন, তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে পানি দূষিত হচ্ছে। এতে মাছের ডিম নষ্ট হয়ে প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে আমাদের জীবিকা হুমকিতে পড়েছে।
এনিয়ে কথা হলে আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার চরে যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই তামাক ক্ষেত দেখতে পাই। কিন্তু চরাঞ্চল আবাদি জমি অস্থায়ী হওয়ায় এখানে ফসলের নির্ভরযোগ্য কোনো জরিপ করা সম্ভব হয় না। তিনি জানান, কৃষকদের তামাক চাষ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হলেও তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাবের কারণে তারা আমাদের দেওয়া পরামর্শ মানছেন না। তামাক চাষ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এদিকে লালমনিরহাট জেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন জানান, তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে নদীতে প্রবেশ করে পানি বিষাক্ত করে তোলে। ফলে এসব রাসায়নিক মাছের শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটায়। মাছের ডিম ধ্বংস করে। দীর্ঘমেয়াদে বিষক্রিয়ার মাধ্যমে মাছ ও জলজ প্রাণির মৃত্যু ঘটায় ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, রাসায়নিক সারের নাইট্রোজেন ও ফসফরাস পানিতে মিশে অতিরিক্ত শ্যাওলা সৃষ্টি করে, যা পানির অক্সিজেন কমিয়ে মাছের মৃত্যুর কারণ হয়। এতে পানি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। যে কারণে আগে তিস্তা নদীতে ১৪০ থেকে ১৫০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ প্রজাতির।
পরিবেশবিদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটের পাশাপাশি তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং অন্যান্য জলজ প্রাণিও দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাদের কারো কারো মতে, তিস্তা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নিয়ে তিস্তার বুক থেকে তামাক চাষ বন্ধ করতে হবে। নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখতে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে সরকারকে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/163524