বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস এবং আমাদের সচেতনতা!
অটিজম ...? আতঙ্কিত হবার মত একটি প্রতিবন্ধকতার নাম অটিজম! উন্নত বিশ্বে এ নিয়ে প্রচুর গবষেণা হচ্ছে কিন্তু অটিজম আসলে কেনো হয় তা আজও অজানা। প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্বে মানুষ যে কত অসহায় অটিজম তারই নিদর্শন। বিশ্বের সেরা গবেষণা আর কল্যাণের চিন্তা চেতনাকে পায়ে ঠেলে উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে এই প্রতিবন্ধকতা। ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও এইডস-এর চেয়ে অটিজমের ভয়াবহতা কোনো অংশে কম নয়। সাধারণত ৩ বছর বয়সের আগেই অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। ইদানিং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে গত ২০ বছরে অটিজম শনাক্তের হার প্রায় ৩০০% বেড়েছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই সমস্যায় মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা তুলনামূলক ভাবে ৩-৪ গুণ বেশি। উপযুক্ত খাদ্য এবং পরিবেশ প্রতিটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। তেমনি মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য প্রয়োজন ভালোবাসা ও উদ্দীপনা। অটিজম হচ্ছে মস্তিষ্কের বিকাশজনিত এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা। অটিজম কেবল একটি প্রতিবন্ধকতা নয়; এটি অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতার সমষ্টি। যে কারণে এটিকে অটিজম úকট্রাম ডিজঅর্ডার (ASD) ) বলা হয়। অটিজম সম্পর্কে সমগ্র বিশ্বে ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছর ২ এপ্রিল ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ হিসাবে পালন করা হচ্ছে। দিবসটিকে ঘিরে নানা ধরনের আয়োজন হয়ে থাকে। জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ২০২৬-এর মূল বিষয়বস্তু হলো “অটিজম ও মানবতা’’ প্রতিটি জীবনেরই মূল্য আছে ”।
প্রতিবছরই এমন প্রতিপাদ্য সামনে রেখে জনসাধারণকে সচেতন করতে বিভিন্ন রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠান নানা আয়োজন করে। অটিজমের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ক) যোগাযোগ স্থাপন করতে না পারা খ) একই কাজের পুনরাবৃত্তি , গ) নির্দিষ্ট বিষয়ে তীব্র আগ্রহ, ঘ) সামাজিক নিয়ম বুঝতে অসুবিধা
সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অসুবিধা: দৃষ্টি সংযোগ (eye contact) এড়িয়ে যাওয়া বা খুব কম করা। নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া। অন্যদের আবেগ বা মুখের ভাষা বুঝতে অসুবিধা। সমবয়সীদের সাথে মিশতে বা বন্ধুত্ব করতে না পারা। কথা বলা বা ভাষা বিকাশে বিলম্ব।
আচরণগত বৈশিষ্ট্য: একই কাজের পুনরাবৃত্তি করা (Repetitive behaviors)। নির্দিষ্ট রুটিন বা অভ্যাসের ওপর অনড় থাকা এবং তার পরিবর্তন পছন্দ না করা। খেলনা বা বস্তু নিয়ে অস্বাভাবিকভাবে খেলা বা সারিবদ্ধ করে রাখা। খুব কম বিষয় বা নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে তীব্র আগ্রহ থাকা।
সংবেদনশীলতা (Sensory Issues): শব্দ, আলো, গন্ধ বা স্পর্শের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা থাকে। ব্যথা বা তাপমাত্রা বুঝতে অসুবিধা।
অন্যান্য বৈশিষ্ট্য: নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকতে পছন্দ করা। অকারণে হাসাহাসি বা হাত নাড়ানো (flapping)। খাবারের বিষয়ে খুব খুঁত খুঁতে হওয়া। অটিজম নিয়ে সচেতন হতে চাইলে মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। আমরা এখনো অটিজম পরিবারগুলোকে নানা কুসংস্কার বা সামাজিক অসচেতনতার কারণে দূরে ঠেলে দেই যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশেষ করে একজন অটিস্টিক বাচ্চাকে নিজের সন্তানের সান্নিধ্যে আসতেও দিতে চাই না! ভাবি-আমার সন্তানের যদি কিছু হয়! আমার সন্তানের অমঙ্গল আশংকায় এই ধরনের চিন্তা যখন করছি তখন একবারও ভাবছি না, সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা কোনোভাবে প্রভাব বিস্তার করে না। একইভাবে অটিস্টিক, বিকলাঙ্গ, সুস্থ, অসুস্থ, মৃত, সুন্দর বা অসুন্দর কোনো জন্মের সাথে আমার নিজের কোনো যোগ নেই- সব সৃষ্টিকর্তার খেয়াল, তাহলে! কেনো একজনকে ভালোবাসবো অন্যকে অবহেলা বা ঘৃণা!।
অটিস্টিক বা যে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকেই আসে এটা কখনই কোনো পাপের ফল বা কোনো কাজের প্রতিফল বলে অনেকে আক্রমণাত্মক কথা বলি যেটা শুধু অনাকাক্সিক্ষতই নয়, অন্যায়! কারণ, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি নিয়ে বিচারিক ক্ষমতা আমাদেরকে দেয়া হয়নি। আপনি আমি জানিনা সৃষ্টিকর্তার বিচারে কে সঠিক আর কে অবাঞ্ছিত! তাই আসুন, অটিজম সচেতনতা দিবসে প্রতিজ্ঞা করি অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তি বা পরিবারগুলোর উপকারে আসতে না পারলেও তাদের ক্ষতির কারণ কখনোই হবো না। আসুন একটু মানবিক মানুষ হতে চেষ্টা করি। অটিস্টিক শিশু তার পরিবার আপনার আমার ভালোবাসার উপর এতটাই নির্ভরশীল যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যেহেতু সে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন পরতে পারে না, নিজের সমস্যাটাও অন্যকে বুঝিয়ে বলতে পারে না, সেহেতু তার চেয়ে অসহায় আর কি হতে পারে। আমরা যদি তাদেরকে তাদের পরিবারকে মানসিক ভাবে সহযোগিতা করতে এগিয়ে না আসি সেটা সত্যিই সীমাহীন অমানবিক। রাস্তায় বাস ট্রেন সামাজিক কোনো অনুষ্ঠান যেখানেই হোক না কেনো, আমরা যেনো তাদেরকে আন্তরিক সহযোগিতার হাত বাড়াই তাহলেই তারা কিছুটা হলেও প্রশান্তির নি:শ্বাস ফেলতে পারবে।
এটা সত্যি যে অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিকে অনেক বেশি সহযোগিতা বা চিকিৎসা দিলেই পরিস্থিতি খুব বদলে যায় তা না। তবে দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন হয়। অনন্তকাল শতভাগ অন্যের উপর নির্ভরশীল থাকার চেয়ে সামান্য একটু উন্নতিও যদি হয় সেটা কম কিসে! অনেক ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। সেটা কেবলই সবার আন্তরিক ভালোবাসা এবং স্নেহময় পরশেই সম্ভব হয়। তাই আসুন অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং এই পরিবারগুলোকে ভালোবাসা শ্রদ্ধা নিবেদন করে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করি। কারণ তারাও মানুষ! তাদেরও সমাজের রাষ্ট্রের প্রতিটি সুযোগ সঠিকভাবে পাবার অধিকার আছে।
লেখক :
এস এম হুমায়ুন কবির
নির্মাতা ও জ্যেষ্ঠ চিত্র-সম্পাদক, অনুষ্ঠান বিভাগ, বাংলাভিশন
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/163437