বিশ্ব অটিজম দিবসে মানবতার নির্দেশনা

বিশ্ব অটিজম দিবসে মানবতার নির্দেশনা

কাল ২রা এপ্রিল বিশ্ব অটিজম দিবস। জাতিসংঘ অটিজম বিষয়টি কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে ২০০৭ সালে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০০৮ সাল থেকে ২রা এপ্রিল “বিশ্ব অটিজম দিবস“ যথাযথ মর্যাদার সাথে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও একটা পর্যায়ে অটিজম বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দিবসটি পালন করছে। ২০২৬ সালে বিশ্ব অটিজম দিবসের প্রতিপাদ্য “অটিজম ও মানবতা - প্রত্যেক জীবন মূল্যবান “। অটিজম শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে সংগৃহীত। যার অর্থ আত্ম কিংবা নিজস্ব/নিজ থেকে এসেছে। এই শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন সুইজারল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানী চিকিৎসক অয়গেন বয়লার। এটি স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) একটা জটিল স্নায়ু বিকাশ জনিত সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়। এখানে স্নায়ু শব্দটা স্নায়ুতন্ত্র কিংবা মস্তিষ্কের সাথে স্নায়ুর সম্পর্ক কে বোঝায়। সচরাচর প্রাক শৈশবকালে এই সমস্যাটি শুরু হয়ে থাকে। সাধারণত শিশু জন্মের দেড় থেকে তিন বছরের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ গুলো প্রকাশ পেয়ে থাকে।

গবেষকবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের কে নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা করে বেশ কিছু লক্ষ্মণ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে যেমন:-
১) যে বয়সে সাধারণত শিশুরা নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় সেই বয়স কিংবা তার থেকে আরো বেশি বয়সে এরা ডাকলে সাড়া দেয় না।

২) দেড় দুই বছর বয়স হলেও এরা স্বাভাবিক শিশুদের মতো খেলাধুলা করে না।

৩) এরা একা-একা থাকতে পছন্দ করে এবং সামনে অন্য কেহ কথা বললে তাদের দিকে একদম তাকায় না।

 ৪) এরা বেশ দেরীতে কথা বলা শেখে এবং খুব সংক্ষেপে কথা বলে আর একই কথা বার-বার বলে।

৫) কেউ যদি এদের কে কোনো প্রশ্ন করে তবে সেই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না দিয়ে ভিন্ন কথা বলে যা প্রশ্নের সাথে মোটেও সম্পর্কিত নয়।

৬) আশেপাশের জিনিসপত্র অথবা অবস্থানের পরিবর্তন মোটেও পছন্দ করে না।

৭) কিছু কিছু বিষয়ে চিন্তাশক্তি ও আগ্রহ অন্য দের থেকে অনেক বেশী।

৮) মাঝেমধ্যেই এরা দুই হাত দিয়ে তালি দেয় আবার কখনো হাত কিংবা পা জোরে ঝাঁকুনি দেয়, কখনোবা তাদের শরীর অনবরত দোলায় আবার কখনো চক্রাকারে ঘোরাতে থাকে।

৯) যে সব শব্দ, গন্ধ, স্বাদ ও মানুষ ওদের পছন্দ নয় সেগুলো সহজে মেনে নিতে পারে না তাই এইসব ক্ষেত্রে এদের আচরণ হয় অস্বাভাবিক। ১০) এদের অনেকের চেহারা শারীরিক গঠন এবং স্বাভাবিক অবস্থায় চলাফেরা দেখে অনেকেই বুঝতে পারবে না যে এরা অটিজম আক্রান্ত তবে ওদের আচরণ ও কথাবার্তা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর বোঝা যায়। 


অটিজম আক্রান্ত হওয়ার সঠিক কারণ এখনো কেউ-ই আবিষ্কার করতে পারেনি। গবেষকবৃন্দ তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। হয়তোবা আগামীতে এর সঠিক কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হবে। অটিজম আক্রান্ত কিনা সেই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তারি পরীক্ষার মতো নির্দিষ্ট পরীক্ষানিরীক্ষা নেই এমনকি কোনো ঔষধ পর্যন্ত নেই। ডাক্তার এবং গবেষকগণ শিশুর আচরণ, শারীরিক বৃদ্ধির লক্ষণ, চাহনি ও কথোপকথন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শুধু ধারণার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এই বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী কিংবা অটিজম প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বিশেষজ্ঞরাই সঠিক ভাবে বলতে পারবে শিশুটি অটিজম আক্রান্ত কিনা। গবেষকবৃন্দ নিশ্চিত করেছেন অটিজম কোনো রোগ নয়, এটা স্নায়ুর বিকাশ জনিত সমস্যার একটি বিস্তৃত রুপ যা অটিজ স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার নামে পরিচিত। আবার কারো মতে এটা শিশুর জন্ম পূর্ব, জন্মকালীন ও জন্ম উত্তর জেনেটিক ও পরিবেশ গত কারনেও হতে পারে। শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় মায়ের সংক্রামক ব্যাধির জন্যও হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বেশি বয়সে সন্তান ধারণ করাও অন্যতম একটা কারণ হতে পারে। তবে কোনো বিষয়ে শতভাগ একমত হওয়া যায়নি এখনো। এটা নিরাময় হবে এমন কোনো সম্ভাবনার কথা আজও শোনা যায়নি। তবে শিশু কালে সঠিক সময়ে পিতামাতা যদি নির্ণয় করতে পারে যে সন্তান অটিজম আক্রান্ত আর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কিংবা গবেষকের শরণাপন্ন হয়ে কিছু পরীক্ষা, ঔষধ, থেরাপি এবং কাউন্সেলিং এর প্রয়োজন হতে পারে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক চর্চা করলে কিছুটা হলেও সামান্য উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অটিজম আক্রান্ত অনেকেরই মাঝে লুকিয়ে আছে সুপ্ত প্রতিভা। বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধীদের মতো এরাও একধরনের প্রতিবন্ধী, তবে এরা প্রতিভাবন্দি নয়। অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে এমন অনেক অটিজম আক্রান্ত মানুষ রয়েছে। যেমন - ১) টেম্পল গ্রান্ডিন। পেশা:- অধ্যাপক, প্রাণীবিজ্ঞানী, ইনি পশু পালনে এক বিপ্লব ঘটিয়েছেন। ২) ইলন মাক্স। পেশা:- নামকরা উদ্যোক্তা। ৩) গ্রেটা থুনবার্গ। পেশা:- পরিবেশ কর্মী, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাপী অন্যতম সংগঠক। ৪) অ্যান্থনি হপকিল। পেশা:- চলচ্চিত্র অভিনেতা। ৫) সাতোশি তাজিরি, পেশা- ভিডিও গেম ডিজাইনার। ৬) ড্যান অ্যাক্রয়েড। পেশা:- অভিনেতা ও কমেডিয়ান। ৭) ড্যাবিন হান্না। পেশা- অভিনেত্রী। এমন আরো অনেকেই আছেন অটিজম আক্রান্ত হওয়ার পরও অনন্য স্বাক্ষর রেখেছে পৃথিবীর বুকে। অন্য কোনো প্রতিবন্ধীদের মাঝে সুপ্ত প্রতিভার সন্ধান পাওয়া যায় না বললেই চলে কিন্তু অটিজম আক্রান্ত দের ক্ষেত্রে প্রসংগটি সম্পূর্ণ আলাদা। তাই আক্রান্তদের পিতামাতার উপর বিশেষ দায়িত্ব শিশু অবস্থাতেই লক্ষ্য করতে হবে তার সন্তান কোন বিষয়টি কে বেশি আকর্ষণ করে। এটা গভীর ভাবে অন্বেষণ করতে হবে এবং ধীরেধীরে ঐ বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ আরো বৃদ্ধির জন্য নিতে হবে নানামুখী পদক্ষেপ। ধৈর্য এইক্ষেত্রে পিতামাতার জন্য কঠিন পরীক্ষা। একমুহূর্তের জন্য ধৈর্য হারালে চলবে না। সার্বক্ষণিক ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে এবং মনের মনিকোঠায় সন্তান কে নিয়ে অসম্ভব কে সম্ভব করা এবং রঙিন স্বপ্নের শক্ত গাঁথুনি নির্মাণ করতে হবে। 

অটিজম আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষাদান পদ্ধতি স্বাভাবিক শিশুদের থেকে আলাদা হওয়া উচিত। নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতিতে এদের পাঠদান সম্ভব নয়। তাই ওদের আচরণ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ অপছন্দ সবকিছু লক্ষ্য করে নিত্যনতুন পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে।  কোন পদ্ধতিতে সে স্বাচ্ছন্দবোধ করছে সেই দিকে লক্ষ্য রেখে প্রয়োজনে পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে প্রতিনিয়ত। তাই যিনি পাঠদান করাবেন তাকে অটিজম বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে, হতে হবে বিচক্ষণ এবং ধৈর্যশীল। আমাদের দেশে কিছু বিবেক বিবর্জিত স্বার্থপর মানুষ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই অসহায় শিশুদের কে পুঁজি করে যত্রতত্র গড়ে তুলেছে অটিজম কিংবা প্রতিবন্ধী স্কুল। অভিজ্ঞতা ও নূন্যতম পারদর্শী না হয়েও চাকুরী নামক সোনার হরিণ ধরতে যেয়ে স্কুল এম.পি.ও ভুক্ত হবে সেই প্রলোভনে প্রভাবিত হয়ে মোটা অংকের টাকা অনুদান দিয়ে আজ অনেকেই পথে বসতে বসেছে। দীর্ঘদিন গত হলেও পায়নি টাকা ফেরত, স্কুল হয়নি অনুমোদন আজও হয়নি এম.পি.ও ভুক্ত করণ। বেশীরভাগ জায়গায় টাকা হাতিয়ে নিয়ে গাঁ ঢাকা দিয়েছে সেইসব স্কুল প্রতিষ্ঠাতা। অটিজম আক্রান্ত শিশুরা কারো অভিশাপ ও পাপের ফসল কিংবা জ্বীন-ভূতের আছর নয়। এরা আমাদেরই সন্তান এই সমাজেরই অংশ। ওদেরও অধিকার আছে স্বাভাবিক মানুষের মতো বেঁচে থাকার। বিশ্ব অটিজম দিবসে এটাই কামনা জাগ্রত হোক মানবতা, জীবন হোক মূল্যবান। 

লেখক :

শাব্বীর পল্লব

গবেষক ও প্রাবন্ধিক 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/163284